সংসদে প্রধানমন্ত্রী
‘বাকস্বাধীনতা যেন বাকশালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে’

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : পিএমও
দেশে বর্তমানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে এবং বাকস্বাধীনতা অবারিত। তবে এই স্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই বাকশালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। এ সময় মুহুর্মুহু টেবিল চাপড়িয়ে তার বক্তব্যকে সমর্থন করেন সংসদ সদস্যরা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই না দেশের জনগণের কাঁধে ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী শাসন চেপে বসুক। ঠিক তেমনি কোনো বিবেকবান মানুষ, দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ অবশ্যই চান না আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গালাগালিতে পরিণত হোক। এ জন্য দল-মতনির্বিশেষে আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’
তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘পারিবারিক পরিবেশে আমরা যে সকল কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না, কেন আমরা জনপরিসরেও সেই শব্দগুলো ব্যবহার করব? কেন আমরা জনপরিসরেও সেই শব্দগুলোকে পরিহার করব না? সংসদের সকল সদস্যের কাছে, দেশের সকল বিবেকবান নাগরিকের কাছে এ প্রশ্ন রেখে যেতে চাই।’
‘আমরা যদি সত্যিই সবাই এ ব্যাপারে একমত হই, তবে আসুন আমরা গালাগালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে ভূমিকা গ্রহণ করি’, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে বিরোধ ও বিভেদ ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সরকারি দলই বলি, বিরোধী দলই বলি, আমরা সবাই মিলে আসুন একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তুলি। সে কারণে সবসময় আমি বলার চেষ্টা করি, আমি বলে থাকি, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’।”
জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভেদ-বিরোধ কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তিকেই পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, সেই পথকেই সুগম করতে পারে, এটি যেন আমরা ভুলে না যাই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থেই শহীদদের প্রতি কর্তব্যের অংশ হিসেবে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আমাদের মধ্যে ভিন্নমত থাকবে। সারা পৃথিবীতেই সেটি থাকে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও থাকবে। এটিও ডেমোক্রেটিক প্র্যাকটিস। কিন্তু ভিন্নমত যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়, সে ব্যাপারে অবশ্যই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
সংসদকে সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সংসদকে আমরা সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করতে চাই। এই অধিবেশনে যে আলোচনাগুলো আমরা করেছি, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের কারও সদিচ্ছার যে অভাব ছিল না, সেটি নিশ্চয়ই প্রমাণিত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা উভয়পক্ষ দেশ এবং দেশের জনগণের স্বার্থে যে কাজ করছি, দেশ এবং দেশের জনগণের স্বার্থে যে আলোচনা করেছি, কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করার চেষ্টা করেছি, সে ব্যাপারে আমার কোনো বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।’
পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্টরা ঋণখেলাপির পরিমাপের হিসাব-নিকাশেও জালিয়াতি করেছে বলে অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষ্য, এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশকে ঋণখেলাপির অভিশাপ থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে বর্তমানে ঋণখেলাপির অনুপাত ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। বিগত নির্বাচনের পর এ হার ছিল ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট চক্রের অনাচার, লুটপাট, দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের কলঙ্ক থেকে বিএনপি যেভাবে বাংলাদেশকে মুক্ত করে নিয়ে এসেছিল, একই চক্রের কারণে ২০২৪ সালে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঋণখেলাপির যে কলঙ্ক, এর থেকেও বিএনপি বাংলাদেশকে ইনশাল্লাহ মুক্ত করে নিয়ে আসবে।’
বিদেশি ঋণের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘বিদেশি ঋণের ভারে জর্জরিত একটি রাষ্ট্র আমরা পেয়েছি। যারা বাংলাদেশকে ঋণের ভারে জর্জরিত করেছে, তাদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশকে এখনো সেই ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। বর্তমান সরকার গত পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণের আসল এবং সুদ বাবদ রেকর্ড ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদিও ফ্যাসিবাদের লুটতরাজ, টাকা পাচারের কারণে এখনো দেশের কাঁধে, জনগণের কাঁধে হাজারো কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ বাকি রয়ে গেছে।’
বিকেল তিনটায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। মাগরিবের নামাজের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সংসদ অধিবেশন সমাপনী-সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ সংসদে পাঠ করে শোনান।
সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী, অধিবেশনের সমাপনী দিনে প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং পরে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রী সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে বক্তব্য শুরু করেন।
উল্লেখ্য, গত ২৭ আগস্ট সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়।





