বাতিলের পথে বিআরটিসির ৩৪০ বাস কেনা
- কোরিয়ান ব্যাংকের ঋণ, শর্তে পরিবর্তন; বাস নয়, কোম্পানি হলেই হবে কোরিয়ান
- চুক্তির মেয়াদ শেষ, তবু বাতিল হচ্ছে না পুরনো দরপত্র, হচ্ছে না নতুন দরপত্রও

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বড় বড় কথা ছিল। স্বপ্ন ছিল আরও বড়। ভাবনাতেই শুরু হয়েছিল গণপরিবহনের ছবি বদলে দেওয়া। কিন্তু সেই ‘কথা, স্বপ্ন, ভাবনা’ থেকে বাস্তবতা বহু দূরে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বাস কেনা প্রসঙ্গে। সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাসে (সিএনজি) চলে এমন ৩৪০টি বাস সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ১৪০টি ঢাকার গণপরিবহনে যুক্ত হবে, বাকি ২০০টি যাবে ঢাকার বাইরে— পরিকল্পনা ছিল এমনই। কিন্তু আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের তিন বছর পর পরিকল্পনাটি এখন অনেকটা বাতিলের পথে।
বাস কেনার সব কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। শেষ মুহূর্তে এসে দরপত্র আহ্বান করা হলেও সেটি এগোয়নি। হয়নি ঋণদাতার বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে চুক্তির শর্ত পূরণ। তবু বাতিল হয়নি পুরনো দরপত্র। হচ্ছে না নতুনও। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে আরও ছয় মাস আগে। মেয়াদ শেষ হওয়ারও তিন মাস আগে বিআরটিসি থেকে সময় চেয়ে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেই প্রস্তাব এখনো প্রস্তাবেই আছে। ওঠেনি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেকে) আলোচনায়। না প্রকল্পটি এগোচ্ছে, না বাতিল হচ্ছে— ঝুলে থাকা এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ কী? এর জবাবও অনিশ্চিত।
বিআরটিসির জন্য সিএনজিচালিত একতলা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস সংগ্রহের প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায় ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। প্রশাসনিক জট, দরপত্র প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং বিদেশি ঋণদাতা সংস্থার নানা জটিলতায় প্রকল্পটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। তবে হঠাৎ করেই গত জাতীয় নির্বাচনের আগে সব কাজে ফেরে গতি। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী দেড় বছরের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা। লক্ষ্য ছিল রাজধানীর নগর পরিবহনব্যবস্থা আধুনিক করা, বাস রুট পুনর্বিন্যাস কর্মসূচিকে সহায়তা করা এবং ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া তেলে চলা পুরনো বাস। পাশাপাশি পরিকল্পনা নেওয়া হয় রাজধানীর বাইরে আন্তঃজেলা পথে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বাস চালুর।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের বড় অংশ, ৮২৯ কোটি টাকা আসার কথা দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের ঋণ থেকে। অবশিষ্ট ৩০৫ কোটি টাকা দেবে সরকার। কিন্তু অনুমোদনের পরপরই শুরু হয় সময়ক্ষেপণ। একনেকের অনুমোদনের পর প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং কোরীয় পরামর্শক নিয়োগ সম্পন্ন করতেই লেগে যায় প্রায় ১৫ মাস। এরপর দরপত্র প্রস্তুত করে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে তা পাঠানো হয় দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংকের কাছে। সেখানে দরপত্র নথি নিয়ে একাধিক দফায় মন্তব্য আসে। প্রতিবারই সংশোধন করে ফের পাঠাতে হয় নথি।
ভোটের আগে তাড়াহুড়া, এখন ভাটা : নির্বাচনের আগে তাড়াহুড়া করে বাস কেনার প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার অভিযোগ ওঠে। দরপত্রে দেওয়া কিছু শর্ত ও আর্থিক কাঠামো ঘিরে প্রতিযোগিতা নিয়েও উঠেছিল প্রশ্ন। বিআরটিসির প্রকাশিত আন্তর্জাতিক দরপত্র বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় বাসের পাশাপাশি যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ সরঞ্জাম কেনা হবে। প্রতিটি বাস সম্পূর্ণ নির্মিত অবস্থায় সরবরাহ করতে হবে। দরপত্রে অংশ নিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০ লাখ মার্কিন ডলার জামানত হিসেবে দিতে হবে। দরদাতাকে বাস সরবরাহ অভিজ্ঞতা থাকতে হবে অন্তত ২০ বছরের। পাশাপাশি থাকতে হবে গত ২০ বছরে বিদেশে কমপক্ষে ২০০টি ডিজেল বাস এবং কমপক্ষে ৩৪০টি সিএনজিচালিত বাস রপ্তানির অভিজ্ঞতা। আর প্রতিবছর কমপক্ষে ২৫০টি সিএনজিচালিত সিঙ্গেল ডেকার এসি বাস তৈরির সক্ষমতা থাকতে হবে বলেও শর্ত দেওয়া হয়। কারখানা ও উৎপাদন সুবিধার প্রমাণ জমা দেওয়ার কথা বলা হয় দরপত্রে। যদিও শেষ পর্যন্ত তখন আর বাস কেনার কাজ এগোয়নি।
এখন অবশ্য নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘আমার তো বাস লাগবে, আমি শুধু এটা জানি। এখন সিএনজির বাস আনবে কি না, প্রকল্প রাখবে, নাকি বাতিল করবে— এটা সরকার জানে। আমার তো প্রকল্প বাতিলের ক্ষমতা নেই।’ বাস সংগ্রহ করার প্রক্রিয়াটি বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে, শোনা যাচ্ছে এলপিজি অগ্রাধিকার পেতে যাচ্ছে? এমন জিজ্ঞাসায় চেয়ারম্যান মেজাজ হারান।
উত্তেজিত কণ্ঠে তিনি শুরু করেন, ‘এলপিজি হলে হবে। সেটার জন্য আলাদা প্রজেক্ট থাকতে পারে। ইভির (বৈদুতিক যান) জন্যও তো অনেক প্রজেক্ট আছে। এটা কেন বাতিল হবে। যেমন চলার তেমনই চলছে।’ এরপর আরও কয়েকটি প্রশ্ন করা হলেও তার কাছ থেকে সুস্পষ্ট কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
যদিও বিআরটিসির অন্য এক কর্মকর্তা এসবের উত্তর দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন জানানো হয়। কিন্তু এখনো তাতে সাড়া পাওয়া যায়নি। প্রস্তাবটি একনেকেই যাচ্ছে না এখনো। এ অবস্থায় প্রকল্পটি শুধু নামেই আছে।’ এই কর্মকর্তা আরও বলছিলেন, ‘সরকার যদি আগ্রহী হতো, তাহলে এটি এগোতো। এখানে লোন অ্যাগ্রিমেন্ট আছে। তাই সরকার চাইলেও প্রকল্প হুট করে বাতিল করে দিতে পারছে না। তবে সরকার যে আগ্রহী নয়, এটা বোঝা যাচ্ছে। ইভি নিয়ে সরকার যতটা আগ্রহী, সিএনজি নিতে ততটা না।’
ঋণের শর্তে হয়নি চুক্তি, হচ্ছে না নতুন দরপত্র : গত ডিসেম্বরে এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ওই মাসের শুরুতে ঠিকাদার নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয় বিআরটিসি। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২৯ জানুয়ারির মধ্যে দরপত্রের কার্যক্রম নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। এর পরও আগ্রহী ঠিকাদারদের দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য আরেক দফা বাড়ানো হয় সময়।
বিআরটিসি সূত্র বলছে, মোট আটটি প্রতিষ্ঠানের দরপত্র জমা পড়ে। নিয়ম অনুযায়ী, দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ার পর অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্য সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবে। দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ার পর অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারিগরি ও আর্থিক যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, আহ্বান করা এই দরপত্র বিজ্ঞপ্তির আয়ু তিন মাস। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে ঠিকাদার নিয়োগ চূড়ান্ত করার কথা ছিল। অথচ চুক্তি করার সময় পেরিয়ে গেছে আরও চার মাস আগে।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে বাস সংগ্রহের প্রকল্পের পরিচালক কাজী আইয়ুব আলীর সঙ্গে একাধিক দিন যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে কিছু ধারণা দেন। তার কথায়, নিয়ম মতে টেকনিক্যাল সাব-কমিটি আগে দরপত্র যাচাই করবে। কারিগরি দিক থেকে উত্তীর্ণ হলে তবেই খোলা হবে আর্থিক প্রস্তাব। সবচেয়ে কম দরদাতাকে নির্বাচন করা হবে চূড়ান্তভাবে। কিন্তু আর্থিক ছাড় না পাওয়ায় কোনো কিছু করা যাচ্ছে না। প্রকল্পের হাতে তো টাকা নেই। তার ওপর প্রকল্পের মেয়াদ নেই। সরকার যদি মেয়াদ বাড়ায়, তাহলেই কাজ এগোবে, নয়তো এখানেই থাকবে থেমে। বলা চলে, প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিক বন্ধের অপেক্ষায় আছে।
এদিকে, মূল প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাব (ডিপিপি) ও ঋণচুক্তির শর্তের বাইরে এসে ঠিকাদার নিয়োগে সহজ করা হয় শর্ত। মূল প্রস্তাবে বলা ছিল, বাসগুলো কোরিয়ান নির্মিত হতে হবে। এখন শর্ত অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যেসব বাস সরবরাহ করবে, সেগুলো কোরিয়ায় তৈরি না হলেও হবে। শুধু প্রতিষ্ঠানটি কোরিয়ান হলেই হবে।
বিআরটিসি সূত্র জানায়, দরপত্র নথির ওপর মোট ৯টি মন্তব্য আসে। এসব মন্তব্য নিষ্পত্তি করতে প্রকল্পের সময়সূচি আরও পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংক দরপত্র নথির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। এরপর গত ১ ডিসেম্বর পত্রিকায় দরপত্র আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
‘বিআরটিসির লজ্জা নেই’ : ঢাকার যে গণপরিবহনের লজ্জার ছবি, সেটি বদলে দেওয়ার বেশ কয়েকটি উদ্যোগের মধ্যে এটি ছিল অন্যতম। বেসরকারি কোম্পানিগুলোয় সরকার চাইলেও নতুন বাস যুক্ত করতে পারছিল না। বাস রুট রেশনালাইজেশনের মতো উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। সফলতার মুখ দেখেনি নগর পরিবহন। ঢাকার বাসের জানালার নেই কাচ, ছাদের টিন মরিচা ধরা। সিটের ভেতর হাঁ করে বেরিয়ে আছে নোংরা স্পঞ্জ— সবই তো নিত্যদিনের চোখে দেখা ঘটনা।
ঢাকার সড়কে রাজকীয় হালে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কাগজে-কলমে মেয়াদোত্তীর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যান। এসব যানের চলাচল ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রধান সড়কগুলোয় দিব্যি চলছে পুরনো ও জীর্ণ বাস। এসব বাস বন্ধ করার সুযোগ নেই। নতুন বাস আমদানি করে পুরনো বাস বন্ধ করারও উদ্যোগ নেই।
যদিও সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিআরটিসি বাস কিনতে আগ্রহী কেন? সেটিই বুঝতে পারছেন না পরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামছুল হক। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘বিআরটিসি বাস এনে কী করবে? তারা তো বাস চালায় না। ইজারায় দিয়ে রাখে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাড়া খাটায়। হাজার কোটি টাকা যে সরকার খরচ করবে, এতে তো গণপরিবহন খাতে আদতে কোনো উন্নতি হবে না। আর বিআরটিসির তো লজ্জা নেই। তাদের তো রাস্তা দখল করে বাস রাখতে হয়। নিজেদের বাস রাখার জায়গাও নেই। বাস কোথায় চালাবে, কোথায় রাখবে— আগে এগুলো ঠিক করা উচিত। বাস কেনার চিন্তা পরেও করা যাবে।’







