সার্জিও গোরের সফর
পর্দার সামনে বাণিজ্য আড়ালে রাজনীতি
- রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে পেয়েছে বিশেষ গুরুত্ব
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দৃঢ় আস্থা রয়েছে

দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গোরের তিন দিনের বাংলাদেশ সফরকে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, নতুন সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়া, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হওয়া বাণিজ্যিক সমঝোতাগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের অবস্থান তুলে ধরাই ছিল এই সফরের মূল উদ্দেশ্য।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় হওয়া এই সফর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সফরকালে সার্জিও গোর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানসহ সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরও পরিদর্শন করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দৃঢ় আস্থা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে উভয় দেশের আগ্রহের কথাও উল্লেখ করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি নতুন সরকারের প্রতি ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক আস্থার একটি স্পষ্ট বার্তা।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে স্বাক্ষর হওয়া বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান জানতেও আগ্রহী ছিল যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাংলাদেশকে উৎসাহিত করাও সফরের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা নেওয়া। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় এবং সেই বার্তাও এই সফরের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হওয়া চুক্তিগুলো নিয়ে বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কী, সেটিও যুক্তরাষ্ট্র জানতে আগ্রহী ছিল।’
সার্জিও গোরের সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর তার কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধিদল আগামী সপ্তাহের শেষে বাংলাদেশ সফরে আসবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারেরও ইঙ্গিত বহন করছে। বাংলাদেশ-সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি (ভ্রমণসতর্কতা) ইতিবাচকভাবে সংশোধন হওয়াও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ছাড়াও রোহিঙ্গা সংকট, খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ), তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
কেউ কেউ মনে করছেন, বাংলাদেশের ওপর চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রেক্ষাপটেও সার্জিও গোরের এই সফরের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। তবে অধ্যাপক ইমতিয়াজ এ ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তার মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বিদেশি বিনিয়োগ। চীন যেমন বড় বিনিয়োগে আগ্রহী, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে চায়। ফলে বিষয়টি শুধু চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সমন্বিত একটি প্রক্রিয়া।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, বৈঠকে আওয়ামী লীগ বা ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে আলোচনা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, সার্জিও গোরের সফর থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে— বর্তমান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমঝোতাগুলোর ধারাবাহিকতা দেখতে আগ্রহী ওয়াশিংটন এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেই বিবেচনা করছে তারা।




