বাংলাদেশের পারমাণবিক মানচিত্রে জায়গা চাইছে যুক্তরাষ্ট্রও
- বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতায় পাঁচ বছরের নতুন এমওইউ সইয়ের চলছে প্রক্রিয়া
- বাণিজ্য চুক্তির শর্ত ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি সামলে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়াই মূল চ্যালেঞ্জ

সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পারমাণবিক যাত্রায় একচ্ছত্র সঙ্গী ছিল রাশিয়া। পাবনার রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিপুল পরিমাণ ঋণ আর হাজারো প্রকৌশলীর প্রশিক্ষণ— সবকিছুতেই ছিল মস্কোর প্রভাব। পাশাপাশি চিকিৎসা ও অন্যান্য খাতে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারে দেশটির সহযোগিতা নিচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু সেই একমুখী নির্ভরতায় এখন পরিবর্তনের হাওয়া। মস্কোর পাশাপাশি এখন হাত বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের দিকেও। ইতিহাস আর বর্তমানের সমীকরণে তৈরি হচ্ছে নতুন কৌশল।
রূপপুরে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে একই সক্ষমতার আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিরও আগ্রহ দেখিয়েছে রাশিয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যেসব বৈঠক ও চুক্তি হয়েছে, তাতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে— বাংলাদেশ তার পারমাণবিক সহযোগিতার মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে জায়গা দিতে চাইছে।
রূপপুর প্রকল্পের ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের ৯০ শতাংশই রাশিয়ার ঋণ— যা বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হবে ২৮ বছরে। প্রকল্প পরিচালনার জন্য এর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও কর্মী রুশ সহায়তায় নিয়েছেন প্রশিক্ষণ। আগামী বছর প্রথম ইউনিট থেকে আশা করা হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের প্রথম বিদেশ সফরই ছিল মস্কোয়, যেখানে রূপপুরকে দুই দেশের সম্পর্কের ‘অনন্য প্রতীক’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। একই মাসে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠকে ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) ও ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
এর মধ্যেই নেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার জন্য সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের উদ্যোগ।
প্রস্তাবিত এমওইউতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং সেজন্য পারমাণবিক জ্বালানি ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি গবেষণা, চিকিৎসা, কৃষি ও অন্যান্য খাতে পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের সুযোগের কথা রয়েছে এতে। এমওইউ স্বাক্ষরের পর মেয়াদ থাকবে পাঁচ বছর। পরে তা বাতিল কিংবা নবায়নের সুযোগ রয়েছে।
যদিও কর্মকর্তারা বলছেন, এটি নতুন কোনো উদ্যোগ নয়; বরং ১৯৮১ সালে সই হওয়া এবং ১৯৯১ সালে সর্বশেষ নবায়িত বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির মেয়াদ বহু আগেই ফুরিয়ে যাওয়ায় নতুন আইনি কাঠামো তৈরির চেষ্টা।
আগস্টের শুরুতে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোরের তিন দিনের ঢাকা সফরে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে এই এমওইউ সইয়ের প্রস্তাব দেয় ওয়াশিংটন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকেও ওঠে বিষয়টি।
গত ৯ আগস্ট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় খসড়াটি নিয়ে আলোচনা হয়।
খসড়াটি আরও পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত হয় সেখানে। এর তিন সপ্তাহ পর আগস্টের শেষে ওয়াশিংটনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল এসএমআর প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জ্ঞানবিনিময়।
মন্ত্রী জানালেন, ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটাতে এসএমআরের সম্ভাবনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে ঢাকা। অন্যদিকে পরবর্তী প্রজন্মের পারমাণবিক প্রযুক্তি উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ফেব্রুয়ারিতে সই হওয়া বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে (যার বিনিময়ে পাল্টা শুল্ক ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়) একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে— যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা কৌশলগত স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনা যাবে না। অবশ্য বর্তমানে নির্মাণাধীন রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র রাখা হয়েছে এই চুক্তির শর্তের বাইরে। তবে ভবিষ্যতে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারে কার্যকর হবে ওই চুক্তি। এতে রুশ সহায়তায় নির্মিত রূপপুরের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ বা জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন কূটনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি হওয়া শঙ্কা দেখছেন অনেকেই।
রূপপুরে বিনিয়োগ, ঋণ ও প্রশিক্ষণের বিশাল কাঠামো এখনো রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে বেঁধে রেখেছে; মস্কোর সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতিও অব্যাহত। একই সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি ও এসএমআর প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ বাংলাদেশের জ্বালানি-বৈচিত্র্যকরণ কৌশলের অংশ বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
তবে বাণিজ্য চুক্তির শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট ইঙ্গিত— ভবিষ্যতে পারমাণবিক প্রযুক্তির উৎস নির্বাচনে বাংলাদেশকে ওয়াশিংটনের কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় রাখতে হবে। এতে ‘রাশিয়া ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝোঁকা’ বলাটা এ মুহূর্তে অতিসরলীকরণ হলেও, দীর্ঘমেয়াদে রূপপুর-পরবর্তী পারমাণবিক অধ্যায়ে ঢাকার পাল্লা কোন দিকে হেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘পারমাণবিক শক্তি শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাশিয়া, ফ্রান্সসহ আরও পাঁচটি দেশের সঙ্গে রয়েছে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি। ১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ গবেষণা চুল্লি এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগের চুক্তি যুগোপযোগী করলে দেশের পারমাণবিক অবকাঠামো আরও শক্তিশালী হবে। বহু দেশের সঙ্গে চুক্তি করা থাকলে একক দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। তবে এক্ষেত্রে সবসময় নিজ দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে আমাদের।’





