স্কুলে স্কুলে ডিজিটাল ল্যাব নেই কার্যকর শিক্ষা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘স্কুলে কম্পিউটার ল্যাব আছে, কিন্তু কখনো ঠিকভাবে কম্পিউটার চালাতে পারিনি’— বলছিল জামালপুর জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। এই বিদ্যালয়ে ২৭টি কম্পিউটারের মধ্যে সচল মাত্র সাতটি। বাকি যন্ত্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে অচল অবস্থায়। শিক্ষক নেই, হয় না নিয়মিত ক্লাসও। ফলে ‘ডিজিটাল শিক্ষা’ তার কাছে এখন শুধু বইয়ের পাতার একটি অধ্যায়।
‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ থেকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে গত এক দশকে দেশের হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা হয়েছে আধুনিক ডিজিটাল ল্যাব। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের অধীনে ২০১৪ সালে ‘সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ও ভাষা প্রশিক্ষণ ল্যাব স্থাপন’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথম ধাপে স্থাপন করা হয় ৪ হাজার ১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ল্যাব।
পরে ধাপে ধাপে আরও হাজারো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্প্রসারণ করা হয় ‘স্কুল অব ফিউচার’ প্রকল্প। উদ্দেশ্য ছিল, শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতের ডিজিটাল কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুত করা।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্কুলগুলোতে কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত এসব ল্যাব এখন কার্যত অচল। কোথাও কম্পিউটার বিকল হয়ে পড়ে আছে, কোথাও নেই ইন্টারনেট আবার কোথাও ল্যাব থাকলেও নেই কোনো আইসিটি শিক্ষক। অনেক প্রতিষ্ঠানে অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা নিজেদের ক্লাসের ফাঁকে নিচ্ছেন ল্যাব ক্লাস। ফলে বিষয়ভিত্তিক চাপের কারণে সম্ভব হচ্ছে না নিয়মিত পাঠদান।
সম্প্রতি জামালপুর, টাঙ্গাইল ও বান্দরবানের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ ল্যাবে কম্পিউটারের বড় অংশই অচল। জামালপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৪টি কম্পিউটারের মধ্যে অচল ১০টি। আবার বান্দরবানের কয়েকটি বিদ্যালয়ে ১৭টি ল্যাপটপের মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র ৮ থেকে ১১টি।
শুধু যন্ত্রপাতিই নয়, তীব্র সংকট রয়েছে আইসিটি শিক্ষকেরও। জামালপুরের একটি বিদ্যালয়ে একমাত্র আইসিটি শিক্ষক মারা যাওয়ার পর দীর্ঘদিনেও নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। টাঙ্গাইলের কয়েকটি বিদ্যালয়ে সরকারিভাবে নেই কোনো আইসিটি শিক্ষক। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অন্যান্য শিক্ষক ক্লাস নেন সপ্তাহে এক দিন বা পরীক্ষার কিছুদিন আগে। পার্বত্য জেলা বান্দরবানের কয়েকটি বিদ্যালয়ে ল্যাব ক্লাস নিচ্ছেন হিসাববিজ্ঞান কিংবা ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষকরা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় শুধু বই পড়ে আইসিটি বিষয় শিখছে তারা, কিন্তু সুযোগ পাচ্ছে না বাস্তবে কম্পিউটার ব্যবহারের। টাঙ্গাইলের কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, তাদের স্কুলে ডিজিটাল ল্যাব আছে কি না, সেটিই নিশ্চিতভাবে জানে না তারা। কোথাও বছরে মাত্র কয়েকদিন ক্লাস হয়, কোথাও আবার পরীক্ষার আগে হঠাৎ কিছু ব্যবহারিক ক্লাস নেওয়া হয়।
অনেক বিদ্যালয়ে ল্যাব কক্ষ ছোট হওয়ায় একসঙ্গে বসার সুযোগও নেই সব শিক্ষার্থীর। বান্দরবানের বালাঘাটা বিলকিস বেগম উচ্চ বিদ্যালয়ে ৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থী একসঙ্গে বসতে পারে না ক্লাসে। অনেকেই বাদ পড়ে যায় হাতে-কলমে শেখার সুযোগ থেকে। বিশেষ করে ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট বলেও রয়েছে অভিযোগ।
অবকাঠামো থাকলেও ব্যবহার না হওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা। জানিয়েছেন, যন্ত্রাংশের উচ্চমূল্য ও সীমিত বরাদ্দের দীর্ঘদিন মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না কারণে নষ্ট কম্পিউটারগুলো। ফলে কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে ল্যাবগুলো। এ ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠান বরাদ্দের অপেক্ষায় যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ করে রাখলেও নিতে পারছে না কার্যকর উদ্যোগ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ৪৪ হাজার ১০৯ কোটি টাকা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। এত বড় বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না ডিজিটাল ল্যাবগুলোর বড় অংশ।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল হাসান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আগের বরাদ্দকৃত কম্পিউটারগুলোর বর্তমান অবস্থা যাচাইয়ের জন্য আমরা কিছু কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছি। তারা রিপোর্ট দিলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
তবে বাস্তব চিত্র বলছে, বহু ল্যাব বছরের পর বছর ধরে একই অবস্থায় পড়ে থাকলেও দেখা যায়নি কার্যকর কোনো হস্তক্ষেপ।
শিক্ষাবিদ আকতার বানু মনে করেন, সমস্যা শুধু অবকাঠামোর নয়, বরং নীতিগত দুর্বলতারও। তার ভাষ্য, ‘প্রত্যেক স্কুলে আইসিটি শিক্ষক থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ইলেকট্রনিক যন্ত্র নষ্ট হবেই, কিন্তু সেই ভয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার থেকে বঞ্চিত রাখা যাবে না। ডিজিটাল শিক্ষায় জোর না দিলে ভবিষ্যতে তারা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।’
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রযুক্তি শিক্ষায় এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে শহর ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে ডিজিটাল ব্যবধান। যেখানে একদল শিক্ষার্থী আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে হয়ে উঠছে দক্ষ, সেখানে অন্যরা এখনো মৌলিক কম্পিউটার শিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেক এবং বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মঈনউদ্দীন আল মাহমুদ সোহেলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, বরং তার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, শিক্ষক নিয়োগ এবং বাস্তব ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে খুব দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়বে এই বিনিয়োগ।
অনেক স্কুলে কোটি টাকার ডিজিটাল ল্যাব আজ শুধুই তালাবদ্ধ কক্ষ, যা পড়ে আছে অচল যন্ত্রের স্তূপ হয়ে। তাই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— অবকাঠামো নির্মাণই কি ডিজিটাল শিক্ষার সাফল্য, নাকি তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ?
• প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন জামালপুর প্রতিনিধি ময়না আকন্দ, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি আবু জুবায়ের উজ্জ্বল এবং বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি মনিরুল ইসলাম মনি।






