১২ কেজির সিলিন্ডারে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ৭০০ টাকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকার মোহাম্মদপুরের রিং রোডের কৃষি মার্কেট এলাকায় মোল্লা এন্টারপ্রাইজ। সেখানকার বিক্রেতা মো. দিদারের কাছে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম জানতে চাইলে বললেন, ‘একদাম ২ হাজার ৪০০ টাকা। বাসায় পৌঁছে দিলে দিতে হবে বাড়তি আরও ৫০ টাকা।’ সরকার নির্ধারিত দামের কথা বললে তার সাফ জবাব, ‘এলপিজি সংকটের কারণে দুই দিন দোকান বন্ধ ছিল। গত রবিবার রাত ৩টা পর্যন্ত জেগে ৩০টি সিলিন্ডার পেয়েছি। বেশি দামে কিনেছি, তাই বেশি দামে বিক্রি করছি। না পোষালে অন্য কোথাও দেখেন।’
এর একটু দূরে আদাবরে রহমতুল্লাহ এন্টারপ্রাইজের মালিক রহমতুল্লাহ একই ওজনের এলপিজির দাম চাইলেন ২ হাজার ২০০ টাকা। আর মোবাইল ফোনে দাম জিজ্ঞেস করলে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের বি এম এন্টারপ্রাইজের মালিক মো ইউসুফ জানালেন, দামাদামি না করলে ২ হাজার ৪০০ টাকা দাম পড়বে।
এভাবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি জেলা শহরেও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি। কোথাও নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। অথচ মাত্র এক দিন আগে রবিবার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। একইভাবে বেড়েছে অন্যান্য ওজনের সিলিন্ডারের দাম। অবশ্য, গত দুই সপ্তাহ ধরে বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছিল ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায়।
মিরপুর ১ নম্বর এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন বলছিলেন, ‘বাজারে দাম অনেক বেশি হওয়ায় কমবে, এই আশায় বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছিলাম। আজ (গতকাল) দোকানে গেলে ২ হাজার ৬০০ টাকা দাম চাইলো দোকানদার। পরে অনেক অনুরোধ করে ২ হাজার ৫০০ টাকায় এক সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে।’
ঢাকার বাইরে মুন্সীগঞ্জে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, ময়মনসিংহে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ এসেছে। কুমিল্লা, বগুড়া, রাজশাহীসহ আরও কয়েকটি এলাকা থেকেও একই অভিযোগ মিলেছে। অন্য ওজনের সিলিন্ডারে আনুপাতিক হারে বেশি দাম রাখা হচ্ছে।
বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের চাপ আরও বেশি। ৩০ ও ৪৫ কেজির সিলিন্ডারে নির্ধারিত দামের চেয়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। একটি রেস্তোরাঁয়
মাসে প্রায় ২০টি বড় সিলিন্ডার লাগে। প্রতিটিতে ১ হাজার ২০০ টাকা বাড়তি দিলে মাসে খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২৪ হাজার টাকা।
বাজারে অভিযান চালাচ্ছে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। মুন্সীগঞ্জে রবিবার তিনটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে, এর মধ্যে অতিরিক্ত দামে বিক্রির দায়ে এক এলপিজি বিক্রেতাকে ৫ হাজার টাকা। গাইবান্ধায় তিন দোকানকে ৮ হাজার ৫০০ এবং বরিশালে দুই দোকানকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সাভারের আশুলিয়ায় চালানের তথ্যে অসংগতির কারণে একটি প্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার টাকা দণ্ড দেওয়া হয়। আরেক প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত দামে বিক্রি, বড় সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা এবং সিলিন্ডারে পানি দেওয়ার অভিযোগে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে দেশে প্রায় ১ কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন। এর ৮০ শতাংশ যায় রান্নায়, বাকিটা শিল্প ও পরিবহনে। আমদানির ৯৯ শতাংশ বেসরকারি খাতের হাতে। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) অপারেটরদের সংগঠন লোয়াব জানিয়েছে, আগস্টে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ আমদানি তেমন কমেনি, তবু বাজারে সরবরাহ কমেছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব, যা পালিত হয়নি। কয়েক দিন ধরে চলা বাজার নজরদারি আগে হলে সংকট তৈরি হতো না বলেও তারা মনে করছেন।
লোয়াবের সভাপতি আমিরুল হক বললেন, এলপিজি আমদানি কমেনি। অপারেটররা সরকার নির্ধারিত দামেই বিক্রি করছে। বেশি দামে বিক্রি না করার নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে।
গত শনিবার জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে আমদানিকারকরা বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও জাহাজ ভাড়া বেড়েছে, তারপরও তারা বিইআরসির নির্ধারিত দামেই পরিবেশকদের গ্যাস দিচ্ছেন। কারসাজি হলে তা পরিবেশক বা খুচরা পর্যায়ে হতে পারে বলে তাদের দাবি।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বললেন, কমিশন নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির তথ্য পেলে বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে। কেউ এলপিজি মজুদ করেছেন কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে প্রতিদিনের সরবরাহ তথ্য নেওয়া হচ্ছে, যা মাঠপর্যায়ে গিয়ে মিলিয়ে দেখা হবে। শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশা করছেন।



