তৌফিক হঠাৎ করেই চলে গেল

তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সৌজন্যে
এভাবে হঠাৎ করে তৌফিক আমাদের ছেড়ে চলে যাবে—ভাবতেই পারিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরটা দেখে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। ও তো আমার চেয়ে ১০ বছরের ছোট। শেষে ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জাহেদ খানের কাছে ফোন করে নিশ্চিত হলাম যে, তৌফিক আর নেই। লন্ডনে ওর ছেলের কাছে গিয়েছিল। ফিরে এসে বিডিনিউজের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন করার কথা। এও শুনলাম, প্রতি বছর বিডিনিউজের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগে তৌফিক লন্ডনে ছেলেকে দেখে আসে। এবারই শেষ দেখা হলো। ছেলের কাছেই শেষ দিনগুলো কাটল তৌফিকের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আশির দশকে সামরিক শাসনবিরোধী উত্তাল আন্দোলনের দিনগুলোতে তৌফিকের সঙ্গে দেখা। তখন সারা দেশে ছাত্র রাজনীতিতে ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ (বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র)-এর জয়জয়কার। সবচাইতে মেধাবী, লড়াকু শিক্ষার্থীরা এ সংগঠনের কর্মী-সমর্থক-সংগঠক। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে সামরিক শাসনবিরোধী উত্তাল আন্দোলনের তীব্রতায় সামরিক সরকার মাঝে মাঝেই ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিচ্ছে। এর বিরুদ্ধেও আবার প্রতিবাদ। তৌফিক প্রায় প্রতিটি মিছিলে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে স্লোগান ধরত। শুধু মিছিলে-স্লোগানে নয়, ওর ডিপার্টমেন্ট ইংরেজি বিভাগে প্রতিটি একাডেমিক কার্যক্রমে ও ছিল অনন্য। ওর মতো বিশুদ্ধ ইংরেজি লেখা ও বলা আমি কম লোকের মাঝেই দেখেছি। কিন্তু এতটুকু কৃত্রিমতা ওর মাঝে ছিল না।
আমি ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার পরে এতদিন ওর সঙ্গে দেখা হয়নি। আমি ১৯৯৮ সালে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে যাই। লন্ডনে আমার খালাতো বোনের বাসায় তৌফিকের পরিবারের আসা-যাওয়া ছিল। সেখানে হঠাৎ একদিন দেখা। এরপরে বিবিসি কার্যালয়ে নিয়মিত দেখা। বিবিসির সঙ্গে ছাত্রজীবন থেকেই আন্দোলনের কারণে যোগাযোগ ছিল। তৌফিকের অজুহাতে সেটা আরও গাঢ় হলো।
আমি দেশে ফিরে আসি। তৌফিকও কয়েক বছর পরে দেশে ফিরে এসে বিডিনিউজ তার পূর্বতন মালিকের কাছ থেকে কিনে নেয়। বিবিসিতে থাকতে তৌফিক যেমন আমার সাক্ষাৎকার ও মন্তব্য নেওয়ার জন্য নিয়মিত যোগাযোগ করত, বিডিনিউজেও একই অবস্থা। নিয়মিতভাবেই টেলিফোনে ও সশরীরে আমাকে যুক্ত হতে হতো। এছাড়াও এত ব্যস্ততার মাঝে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে দেখা হতো। হঠাৎ করে মধ্যরাতে আমার ইস্কাটনের বাসায় চলে আসত। সব কাজ ভুলে রাতভর আড্ডায় আমার স্ত্রী ও পুত্রসহ সে মাতিয়ে রাখত। ও প্রতি বছরই ওর বাসায় বৈশাখী আড্ডায় ও হোটেলে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে ডাকত। আমি প্রতিবার যেতে না পারলেও ও কিন্তু আমাকে নিজে ফোন করে দাওয়াত করতে ভুলত না।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ওর সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ হতো। ওর কাছ থেকে ওর পটভূমি থেকে পরিস্থিতি বুঝতে সহায়তা হতো। ওকেও আমি আমার দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি ও পূর্বাভাস দিয়েছি। আমাদের পারস্পরিক কাজের ক্ষেত্রে তা অনেকবার কাজে দিয়েছে। সামাজিক অনুষ্ঠানে নতুন কারো সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় ও আমাকে এমনভাবে তুলে ধরত, যেন আমার চেয়ে ভালো আর কেউ নেই ওর আশেপাশে। আমাকে খুবই সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দিয়েছে তৌফিক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।
ওর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হচ্ছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। দেশে অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে বিডিনিউজ। তৌফিক আমাদের মাঝে না থাকলেও বিডিনিউজ ওর কীর্তিকে নতুন প্রজন্মের সামনে সগৌরবে তুলে ধরবে—এ কামনাই করছি।
(বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর আকস্মিক মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণা করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকেমে লিখেছেন জনস্বাস্থ্যবিদ, ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুশতাক হোসেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সৌজন্যে এই লেখাটি প্রকাশ করা হলো)



