স্বপ্ন থেকে বাস্তবে রূপপুর
পারমাণবিক বিদ্যুতের নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ

সংগৃহীত ছবি
সময়ের এক অনন্য সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু হবে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) । যার মধ্য দিয়েই মূলত এই কেন্দ্র থেকে ধাপে ধাপে শুরু হবে বহুল কাঙ্ক্ষিত সেই বিদ্যুৎ উৎপাদন।
পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মার তীর ঘেঁষে, সবুজের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প যেন নিঃশব্দে বহুদিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল এ মুহূর্তের জন্য। আজ সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রি-অ্যাক্টরের হৃদয়ে প্রবেশ করবে পারমাণবিক জ্বালানি, আর তার সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠবে শক্তির এক নতুন সুর।
এই প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের বাস্তব রূপ। দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
দুটি ইউনিট মিলে কেন্দ্রটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। যার প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং হবে। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও চলছে পুরোদমে। পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হলে দেশের শিল্প, কৃষি ও নগরজীবনে আসবে নতুন গতি।
২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। একই বছরের জুনে শুরু হবে দ্বিতীয় ইউনিটের ফুয়েল লোডিং বা জ্বালানি স্থাপনের কাজ
প্রায় আড়াই হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে। এ ছাড়া নির্মাণকালে প্রতিদিন প্রায় ২০-২৫ হাজার মানুষ কাজ করছেন প্রকল্প এলাকায়।
আগামী আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
মাহবুব আনামের মতে, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। একই বছরের জুনে শুরু হবে দ্বিতীয় ইউনিটের ফুয়েল লোডিং বা জ্বালানি স্থাপনের কাজ। ওই বছর সেপ্টেম্বরে রূপপুরের দুটি ইউনিট থেকে মোট ২২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বড় ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর।
এদিকে প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাজ শেষ হয়েছে গত বছরের মে মাসে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য সঞ্চালন লাইনের কাজ চলছে পুরোদমে। এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তা শেষ হবে বলে জানিয়েছে পিজিসিবি।
আন্তর্জাতিক পরমাণু গবেষক এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শৌকত আকবর বলেছিলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং একটি বড় মাইলফলক। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রথম ধাপ, যা নির্মাণ পর্যায় থেকে কার্যক্রম শুরুর দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
তিনি জানাচ্ছিলেন, ফুয়েল লোড করা মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বরং এটি একটি সূক্ষ্ম ও দীর্ঘ কারিগরি প্রক্রিয়ার শুরু। জ্বালানি লোড করার পর রি-অ্যাক্টরের ভেতরে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত ও টেকসই চেইন রি-অ্যাকশন বা ‘ফিশন বিক্রিয়া’শুরু করা হয়। ধাপে ধাপে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি করা হয় নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা। তবে এই সময়ে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে তা গ্রিডে দেওয়া না গেলেও পূরণ করবে প্রকল্পের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা।
‘ভূ-রাজনীতির চক্করে জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানান জটিলতা। কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানির ক্ষেত্রে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় সহায়ক হবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এটি পরিবেশবান্ধব। জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনে রাখবে ভূমিকা’— যোগ করেন ড. শৌকত আকবর।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক পরমাণু বিশেষজ্ঞ ড. মো. শফিকুল ইসলাম। বললেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানির সংকট, ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচ আর পরিবেশগত দিক বিবেচনায় উন্নত বিশ্ব এখন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশকেও এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ দ্রুত শেষ করে নতুন আরও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে।’
জ্বালানি লোডিং ও বিদ্যুৎ উৎপাদন
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর রি-অ্যাক্টর। এখানেই ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোড করা হবে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ বা নিউক্লিয়াস বিভাজন প্রক্রিয়ায় কাজ করবে। পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। এই তাপশক্তি দিয়ে পানিকে উচ্চচাপে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হয়, যা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রি-অ্যাকশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চলে।
রি-অ্যাক্টরের ডিজাইন অনুযায়ী, ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি রি-অ্যাক্টর কোরে স্থাপন করতে হবে, যার জন্য সময় লাগবে ৩০ দিন। এ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুসরণ করে সম্পন্ন করতে হয় এবং বিশেষ মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। জ্বালানি লোডিং শেষে শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ। এ পর্যায়ে ডিজাইন অনুযায়ী নিউক্লিয়ার ফিশন রি-অ্যাকশন ঘটানো হয় এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে, যার জন্য প্রায় ৩৪ দিন সময় প্রয়োজন হবে। পরীক্ষা শেষে রি-অ্যাক্টরের পাওয়ার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করে পর্যায়ক্রমে ৩%, ৫%, ১০%, ২০%, ৩০% উন্নীত করা হবে, যার জন্য সময় লাগবে ৪০ দিন। রি-অ্যাক্টরের পাওয়ার ৩ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে শুরু হবে বিদ্যুৎ সরবরাহ। পরে ধাপে ধাপে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি চলবে নিরাপত্তাবিষয়ক নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সব মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস।
বিদ্যুৎ মিলবে কতদিন
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। এই সময়ে এখান থেকে পাওয়া যাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। তবে প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত কেন্দ্রটির আয়ু বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর। ফলে অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো তেল, গ্যাস কিংবা কয়লা কেনার কোনো ঝক্কি-ঝামেলা নেই। দেড় বছর পর এক-তৃতীয়াংশ করে করতে হবে জ্বালানি পরিবর্তন।
নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী, তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। অর্থাৎ এই সময়ে জ্বালানি আমদানি নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। এরপর বাংলাদেশকে জ্বালানি তথা ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে সেই জ্বালানি দুই বছর পর পর পরিবর্তন করলেই চলবে।
নিরাপত্তা-ব্যবস্থা
পারমাণবিক শক্তির কথা শুনলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে ভয় কিংবা অজানা আশঙ্কা। পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন গোটা বিশ্বেই অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি প্রক্রিয়া। এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণে পেরোতে হয় নিরাপত্তামূলক নানা ধাপ।
রূপপুরে ব্যবহৃত তৃতীয় প্রজন্মের রি-অ্যাক্টর প্রযুক্তি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতেও স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা-ব্যবস্থা কাজ করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ-এর নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট, ফুয়েল লোডিং কমিশনিং লাইসেন্স পাওয়ার মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরমাণু বিশেষজ্ঞ শৌকত আকবর বলছেন, আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী এই কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ দায়বদ্ধ। সে জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা এবং রাশিয়া কাজ করছে। জ্বালানি লোডিংয়ের আগে নানান পর্যায়ে দুই হাজারেও বেশি পরীক্ষা করা হয়েছে। বিভিন্ন ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরই জ্বালানি লোড করার অনুমতি মিলেছে এই কেন্দ্রে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, বরং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই এখন বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণযজ্ঞ শেষে এখন শুরু হচ্ছে এর কার্যকারিতার মূল ধাপ।
নিরাপত্তার বিষয়ে অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেছিলেন, জ্বালানি লোডিংয়ের পর এটি এখন পারমাণবিক অবকাঠামোতে পরিণত হবে। এখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে যাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই ধাপে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি যোগ করেছেন,
‘আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্র্যাকটিস হলো এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা তৃতীয় পক্ষ দিয়ে পরীক্ষা করানো। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুরোপুরি রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। আগে থেকে তৃতীয় পক্ষের বিশেষজ্ঞ দল রাখলে ভালো হতো। তবে জ্বালানি লোডিংয়ের পর যদি ১০ থেকে ১২ মাসের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়, তাহলে বোঝা যাবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে, তা না হলে প্রশ্ন থাকবে’—যোগ করলেন তিনি।
‘একবার বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর কেন্দ্রটি অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো হুটহাট বন্ধ করার সুযোগ নেই। তাই শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। আশা করব, আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই কেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে। সেই সঙ্গে দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও দ্রুত শেষ করা খুবই দরকার’
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. প্রীতম কুমার দাসের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রটোকলগুলো এতটাই নিশ্ছিদ্র যে, সামান্যতম বিচ্যুতি ঘটলে পুরো প্রকল্প সেখানেই থমকে যেতে পারে। এতে বিশাল অঙ্কের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করার প্রক্রিয়াই আটকে যাবে। রূপপুরের এই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ মূলত নির্ভর করছে ‘জিরো এরর’ বা শূন্য ত্রুটি নীতির ওপর।
রাশিয়ার ‘ফাস্ট নিউট্রন’প্রযুক্তির উদাহরণ দিয়ে রূপপুরের ব্যবহৃত জ্বালানি বা বর্জ্যকেও পুনরায় ব্যবহারের সম্ভাবনা জানালেন ড. প্রীতম।
তার মতে, ব্যবহৃত ইউরেনিয়ামের উপজাত বা ওয়েস্ট থেকে ভবিষ্যতে আবারও জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব হবে, যা ভারত ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো সফলভাবে পরীক্ষা করছে। সেটি সম্ভব হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ আরও কমে আসবে।
শুরুর গল্প
দেশে পারমাণবিক বিদ্যুতের প্রাথমিক ধারণা আসে ষাটের দশকে। ১৯৬২ সালে সম্ভাব্য ১২টি স্থান মূল্যায়নের পর পাবনার রূপপুরকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়। পরে ১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান ‘সফরাটম’ কর্তৃক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হলেও তৎকালীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে আটকে যায় প্রকল্পটি। তবে এ উদ্যোগ বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির ভিত্তি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ১৯৮১ সালে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৯৮৬ সালে ঢাকার সাভারে ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার গবেষণা রি-অ্যাক্টর চালু করে।
১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানিনীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তিসই হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পরমাণু সংস্থা রসাটমের মধ্যে সই হয় আরেকটি চুক্তি। ওই চুক্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবলের প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছরের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জীবাশ্ম জ্বালানির সঙ্গে তুলনা
পারমাণবিক বিদ্যুতের বড় সুবিধা হলো এর জ্বালানি দক্ষতা বেশি। একটি এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন কয়লা প্রয়োজন হয়। সেখানে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি বছর মাত্র ২৭ টন পারমাণবিক জ্বালানি লাগে। একই সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকে বছরে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, তা প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের সমপরিমাণ। শুধু বড়পুকুরিয়া বাদে বাকি সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানি করতে হয়, যা ব্যয়বহুল।
অন্যদিকে দেশে গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসছে। নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রমও চলছে ধীরগতিতে। ভয়াবহ গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুতের পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যান্য খাতেও রয়েছে গ্যাস স্বল্পতা। এমন পরিস্থিতিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পারমাণবিক শক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক থাকলেও আধুনিক বাস্তবতায় এটি এখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে বিবেচিত। কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি হওয়ায় এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বছরে ২০ মিলিয়ন টন এবং গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় ৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করবে।



