ঘাটতি নয়, গ্রামের লোডশেডিং কারিগরি কারণে— বললেন বিদ্যুৎমন্ত্রী

গ্রামে লোডশেডিং থাকলেও তা বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে নয়, বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কারিগরি সমস্যার কারণে হচ্ছে—এমনই তথ্য তুলে ধরেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং থাকলেও তা আগের চেয়ে কম দাবি করে মন্ত্রী বলেছেন, ‘গ্রামে-গঞ্জে যে লোডশেডিং হচ্ছে, এটা বেশিরভাগই টেকনিক্যাল (কারিগরি) কারণে, বিদ্যুতের শর্টেজের (ঘাটতি) জন্য নয়। এটা আমরা ঠিক করার চেষ্টা করছি।’
আজ সোমবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বললেন ইকবাল হাসান মাহমুদ।
‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’ শীর্ষক ওই নাগরিক সংলাপের আয়োজন করে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎমন্ত্রী।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পেয়ে গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরমে। বিদ্যুৎ না পেয়ে কয়েক দিন আগেই ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা বিভিন্ন এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির স্থানীয় কার্যালয়ে হামলা চালান। এ সংকট নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে খোদ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। এমন প্রেক্ষাপটে গ্রামাঞ্চলের লোডশেডিংয়ের জন্য বিদ্যুতের ঘাটতি নয়, কারিগরি ত্রুটিকেই কারণ হিসেবে তুলে ধরলেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। তিনি জানান, এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছে সরকার।
দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয় গত ২৮ জুন মধ্যরাতে। এরপর তা কমলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। যদিও পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। গ্রামাঞ্চলের লোডশেডিং পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী আজ ক্যাবের সংলাপে কথা বলছিলেন বেলা ১১টার দিকে। এর কিছু সময় পর, একই দিন দুপুর ৩টায় দেশে লোডশেডিং হয় ২১৩ মেগাওয়াট। আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে থাকায় (বৃষ্টি হলে চাহিদা কমে, গরম বাড়লে চাহিদা বাড়ে) সারা দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ২৬৩ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৫০ মেগাওয়াট।
সংলাপে বিদ্যুৎমন্ত্রী বললেন, শতভাগ বিদ্যুতায়ন করতে গিয়ে অপরিকল্পিতভাবে যেসব লাইন করা হয়েছে, সেখানে লোড বেশি দেওয়া হলে সমস্যার সৃষ্টি হয় এবং ওই এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ চলে যায়। এ সমস্যার সমাধানে পল্লী বিদ্যুৎকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তবে এ সমস্যা পুরোপুরি দূর হতে সময় লাগবে বলেও তিনি জানান।
সংলাপে আর্থিক সংকট থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের উত্তরণের প্রধান উপায় হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা তুলে ধরেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। তিনি বললেন, জ্বালানি আমদানি কমাতে পারলে সরকার বিপুল অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় করতে সক্ষম হবে। সেই অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া দায় মেটানো সম্ভব হবে।
এ লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মন্ত্রী।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য কৃষিজমি ব্যবহারের বিষয়ে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে জানিয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেছেন, এ কারণে প্রকল্পের জন্য পতিত বা অনাবাদি জমিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলেও মূলত জ্বালানি ও অর্থসংকটের কারণে কয়েক বছর ধরেই গ্রীষ্মে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে লোডশেডিং হচ্ছে। এর সঙ্গে এবার বিশ্বকাপ খেলা দেখার কারণে বিদ্যুতের চাহিদাও আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। এতে লোডশেডিংও বেড়েছে। তবে বৃষ্টিপাতের কারণে তাপমাত্রা কিছুটা কম হওয়া এবং সরকারের নানা উদ্যোগে উৎপাদন সামান্য বৃদ্ধির ফলে আজ লোডশেডিং কম ছিল। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়লে লোডশেডিংও বাড়বে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বকেয়া ও ঋণের দায় বর্তমান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছে সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বিল বাবদ পাওনা প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বকেয়া আদায়ে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা চাপ দিচ্ছেন। জ্বালানি কেনার অর্থের সংকটের কথা জানিয়ে তারা চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করছেন না। আবার এত বিপুল বকেয়া পরিশোধ করার সামর্থ্যও এ মুহূর্তে সরকারের নেই। অন্যদিকে লোডশেডিং বাড়লে জনরোষও বাড়তে পারে। বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগে ফেলেছে।






