সরকার বদলালে বদলে যায় দুদকের মামলার গতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে বদলে যায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার গতি-প্রকৃতি। এক সরকারের আমলে যেসব মামলা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে, সরকার বদলালে সেসব মামলার অনেকটাই হারিয়ে যায় আড়ালে। আবার নতুন করে সক্রিয় হয় অন্য কিছু মামলা। এতে দুদকের নিরপেক্ষতা ও মামলার ধারাবাহিকতা নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা প্রশ্ন।
দুর্নীতির লাগাম টানতে দুই দশক আগে গঠিত হয় স্বায়ত্তশাসিত কমিশনটি। সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পেলে অভিযোগ নেয় দুদক। এরপর অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পেলে করে মামলা। প্রাথমিক তদন্তে আর্থিক অনিয়মের প্রমাণসহ দেওয়া হয় চার্জশিট বা অভিযোগপত্র। ধারাবাহিকভাবে একরকম আটঘাট বেঁধেই শুরু হয় বিচার। কিন্তু দিন শেষে টিকছে না অর্ধেক মামলা।
নির্দোষ প্রমাণে খালাস পাচ্ছেন আসামিরা। কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ। ৫৫ মাসে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার তথ্য বিশ্লেষণে ফুটে উঠেছে এমন চিত্র। এবার প্রশ্ন— তাহলে অনিয়মের অভিযোগগুলোই কি ভুয়া ছিল? আবার মিথ্যা হলে দুই দফায় প্রমাণ মিলল কীভাবে?
নিষ্পত্তি হওয়া মামলা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৫৫ মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে ১ হাজার ৪৭৫টি মামলা। এর মধ্যে চার্জশিট পর্যায়েই বাতিল হয়েছে ১৩৫টি। আর রায়ে নিষ্পত্তি হওয়া ৫৪৮ মামলার সব বিবাদী খালাস। আর ৭৯২টিতে সাজা হয়েছে আসামিদের। ২০২২ সালে সবচেয়ে বেশি ৬১ শতাংশ সাজার হার ছিল। ২০২৩ সালে এই সাজা কমে ৫৭ শতাংশ হয়েছিল। আর ২০২৪ সালে সবচেয়ে কম ৪৭ শতাংশ মামলায় সাজা হয়েছিল। তবে ২০২৫ সাল ও চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সাজার হার ৫০ শতাংশে নেমেছে। সাজার হার কমার সঙ্গে মামলার নিষ্পত্তির হারও নিম্নমুখী। ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ৩৪৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল। পরে ২০২৩ সালে ৩৪১টি এবং ২০২৪ সালে ২৯৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। তবে ২০২৫ সালে বিচার শেষ হয়েছে সবচেয়ে কম ২৬৭ মামলার।
কমিশনের মামলার পরিসংখ্যান অনুসারে, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত চলমান রয়েছে দুর্নীতির ২৭৯৩টি মামলা। তবে ২৯২টির কার্যক্রম স্থগিত। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ২২৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে চার্জশিট পর্যায়ে শেষ হয়েছে ১০টি। সাজার রায়ে নিষ্পত্তি ১১৪ এবং খালাস ১০২টিতে। এক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ মামলায় আসামির সাজা হয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৬৭টি মামলায় নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৪টি মামলায় সাজা এবং ১১৮টি মামলায় খালাস দেওয়া হয়েছে। তবে ১৪টি মামলা চার্জশিটেই বাতিল হয়েছে। এক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ মামলায় আসামির সাজা হয়েছে। একইভাবে ২০২২ সালে ৬১ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৫৭ ও ২০২৪ সালে ৪৭ শতাংশ মামলায় সাজা হয়েছে বিবাদীদের।
দেখা গেছে, জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন এবং কর ফাঁকি ও দুর্নীতির বহু মামলায় অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে দুদক। এসব মামলার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০০৭ সালে দুদকের করা মামলায় ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর খালাস পান সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী। ১৭ বছর পর জানা যায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা মেলেনি।
অবৈধ সম্পদ অর্জনে অভিযোগে ২০১৪ সালে দুদকের করা মামলায় ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে খালাস দেন আদালত। ১০ বছর পর তিনি নির্দোষ প্রমাণিত। আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০০৭ সালে দুদকের করা মামলায় গত বছরের ২৫ মার্চ খালাস পান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলু। ১৮ বছর পর তার আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
কর ফাঁকি ও দুর্নীতির অভিযোগে ২০০৭ সালে দুদকের করা মামলায় গত বছরের ২২ জুন খালাস পান বিএনপির সাবেক ভূমি উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ও তার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন। ১৮ বছর পর রায়ে তারা নির্দোষ প্রমাণিত হন। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১৪ সালে দুদকের করা মামলায় গত বছরের ২৩ জুলাই খালাস পান বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। ১১ বছর পর তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা মেলেনি। জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০০৯ সালে করা মামলায় গত বছরের ৫ অক্টোবর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে খালাস দেন আদালত। ১৬ বছর পর তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পান।
আবার আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির ১০টি মামলা হয়েছিল। ২০০১ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে এসব মামলায় শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে কয়েকটি মামলায় তাকে অভিযুক্তও করা হয়। তবে কোনো মামলায় তার বিচার হয়নি। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এতে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে এসব মামলায় দায়মুক্ত হন শেখ হাসিনা। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তার বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির মামলা হচ্ছে।
২০০৭ সালের ১৩ জুন সূত্রাপুর থানায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এতে সম্পদের তথ্য গোপন ও অবৈধভাবে ২৯ লাখ টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ আনা হয়। পরের বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত দুই ধারায় তাকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেন। সেই সঙ্গে তাকে জরিমানাও করা হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন মায়া। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ২৭ অক্টোবর তাকে খালাস দেন হাইকোর্ট বেঞ্চ। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে আবার দুর্নীতির অভিযোগে দুটি মামলা হয়েছে।
চারটি কারণে আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করা যায় না উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক আগামীর সময়কে বলেছেন, মামলা করার মতো জ্ঞানের অভাব, তদন্তে পারদর্শিতার ঘাটতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও হয়রানিমূলক মামলা হওয়ার কারণে খালাস পেয়ে যান আসামিরা। দুদকে যারা প্রাথমিক অনুসন্ধান ও তদন্ত করেন, এসব ব্যাপারে তাদের আইনি জ্ঞান খুবই অল্প। তাদের যথেষ্ট প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। ঢালাওভাবে না হলেও নিশ্চয় দুদককে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়।
দুদকের প্রসিকিউটরদের মতে, দুর্নীতির মামলায় সাজা কম হওয়ার পেছনে প্রক্রিয়াগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট কাজ করছে। দুদক প্রাথমিক অনুসন্ধানে সত্যতা পেয়ে মামলা করে। কিন্তু ফৌজদারি আদালতে অপরাধ প্রমাণে সাক্ষী একমাত্র মানদণ্ড। যদি সাক্ষী ঠিকভাবে উপস্থাপন করা না হয়, সেক্ষেত্রে অভিযোগ প্রমাণ করা যায় না। দুর্নীতির অনেক মামলা নিষ্পত্তি থেকে ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে। এত দীর্ঘ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি হারিয়ে যায়। কেউ চাকরি থেকে অবসরে চলে যান। আবার কোনো বিচার চলাকালে মারা যান অথবা মামলার বিষয়বস্তু ভুলে যান। সেক্ষেত্রে যথাযথ সাক্ষী বা ডকুমেন্টস উপস্থাপন করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের দুর্বলতায় আসামিরা পার পেয়ে যান। তবে দায়িত্বরত প্রসিকিউটররা মামলার অভিযোগ প্রমাণে কোনো গাফিলতি রাখেন না।
তবে আইনজ্ঞদের মতে, দুদকের প্রসিকিউটর নিয়োগে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতাসীন দলের আইনজীবীদের নিয়োগ দেওয়ার কারণে মামলার প্রতি তাদের পেশাগত দায়বদ্ধতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য বেশি কাজ করে। সরকার বদলের সঙ্গে মামলার গতিও বদলে যায়।
দুদকের প্রসিকিউশনের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা জানালেন, প্রাথমিক অনুসন্ধান বা মামলার পর তদন্তে তাদের কোনো গাফিলতি থাকে না। তারা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে মামলার তদন্ত করে থাকেন। সেক্ষেত্রে মামলার সাজা বা খালাসের বিষয়টি সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহীনুর ইসলাম বললেন, মামলার তদন্তে ও কাগজপত্রে ত্রুটি থাকলে বিচারের পর্যায়ে এসে অভিযোগ প্রমাণ করা যায় না। সাক্ষীকে জেরা করলে তখন সত্য বিষয়টি উঠে আসে। মামলায় যারা দোষী না, তাদের আসামি করা হয়। অথচ যারা প্রকৃত দোষী, তারা বাইরে থেকে যান। যে কারণে বিচার শেষে আসামিরা খালাস পেয়ে যান।





