আজ বিশ্ব বাঘ দিবস
সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জে সুন্দরবনের বাঘ
- ২০২৪ থেকে কোনো বাঘের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি
- সম্প্রতি প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে দেখা গেছে একাধিক বাঘ

সংগৃহীত ছবি
এক সময় সুন্দরবনে বাঘ শিকার ছিল গর্বের বিষয়। কাঁধে বন্দুক নিয়ে দল বেঁধে বাঘ মারতে বনে ঢুকতেন শৌখিন শিকারিরা। বাঘ শিকার করে চামড়া, দাঁত, নখ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংগ্রহ করে ফিরতেন তারা। ফিরে এসে মানুষকে শোনাতেন বীরত্বের গল্প। তখনকার সময়ে বনের রাজা বাঘকে অপবাদ দেওয়া হতো মানুষখেকো হিসেবে। আর বাঘশিকারিকে ভূষিত করা হতো রাষ্ট্রীয় বীরত্বপূর্ণ খেতাবেও। গণনার ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় তখন জানা ছিল না বাঘের সঠিক সংখ্যা। তবে সুন্দরবনে তখন বর্তমানের চেয়ে বাঘের সংখ্যা যে বহুগুণ বেশি ছিল, তা নিশ্চিত করে বলা যায়।
যখন বাঘ শিকার ছিল গর্বের: গত শতাব্দীর ৫০ থেকে ৭০-এর দশক পর্যন্ত বাঘ শিকার ছিল এক ধরনের গৌরবের বিষয়। বনজীবীদের নিরাপত্তার নামে হত্যা করা হয়েছে বহু বাঘ। সে সময়ে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামের পচাব্দী গাজী ওরফে আব্দুল হামিদ গাজীর নাম রয়েছে বাঘ শিকারির তালিকায় ইতিহাসের শীর্ষে।
স্বাধীতার পর হয় আইন: ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আদেশ জারির মাধ্যমে সুন্দরবনের বাঘ শিকার আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০১২ সালে আইন সংশোধন (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) করে বাঘ শিকার, হত্যা, পাচার ও অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়। ফলে বন বিভাগ আইনি ভিত্তিতে বাঘসহ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আরও কঠোর কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে।
মানুষ-বাঘে দ্বন্দ্ব: খাদ্যের সন্ধানে বা প্রাকৃতিক নানা কারণে লোকালয়ে ঢুকে পড়লে মানুষ দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে হত্যা করত এ রাজসিক প্রাণীকে। ২০০১ সাল থেকে আড়াই দশকে পূর্ব সুন্দরবনে ৩০টিসহ মোট ৯১টি বাঘের মৃত্যুর রেকর্ড রয়েছে বন বিভাগের কাছে। এর মধ্যে পাচারকারী ও চোরা শিকারিদের হাতে ২৬টি, গ্রামবাসীর পিটুনিতে ১৪টি, বনদস্যুদের হাতে ১৮টি, বার্ধক্যজনিত কারণে ২১টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৩টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। ধারণা করা হয়, এর বাইরেও হত্যার শিকার হয়েছে আরও বাঘ। অন্যদিকে বাঘের অক্রমণে প্রাণ হারিয়েছে ৪২৫ জন এবং আহত হয়েছেন ৯৫ জন।
সফলতা: সবচেয়ে ইতিবাচক দিন হলো, ২০২৪ সালের পর একটি বাঘও হত্যা বা মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি সুন্দরবনে। তবে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খাল এলাকায় শিকারিদের পেতে রাখা ছিটকা ফাঁদে আটকা পড়েছিল একটি বাঘিনী। পরে বন বিভাগ বাঘটি উদ্ধারের পর ছয় মাস চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলে। সেই বাঘিনীটি ১২ জুলাই অবমুক্ত করা হয় সুন্দরবনে। বাঘিনীর চলাচল পর্যবেক্ষণে বনের ৮ কিলোমিটার এলাকায় বসানো হয় স্বয়ংক্রিয় ২০টি ট্র্যাপ-ক্যামেরা।
বাঘ সংরক্ষণে উদ্যোগ: আইনের প্রয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে টহল ও নজরদারি বৃদ্ধি, বনজীবীদের সচেতনতা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ফলে সম্প্রতি কমেছে মানুষ-বাঘের দ্বন্দ্ব-সংঘাত।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেছেন, সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বন বিভাগ এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে। স্মার্ট প্যাট্রলিং, ড্রোনের ব্যবহার এবং ফুট েট্রলিংয়ের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান ও টহল কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ২০২৪ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত একটি বাঘের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। বাঘ সুরক্ষায় লোকালয়-সংলগ্ন এলাকায় ৭৫ কিলোমিটার জুড়ে বেড়া নির্মাণ, সুপেয় পানির পুকুর খনন, আশ্রয়ের জন্য টিলা নির্মাণ, ভরাট হওয়া ভোলা নদী খননসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন: বাঘ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং জাহাঙ্গীর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. এম এ আজিজ বললেন, ‘বাঘ রক্ষা করতে হলে আগে হরিণ শিকার বন্ধ করতে হবে। কারণ বাঘের প্রধানত খাদ্য হরিণ। খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়লে বাঘের টিকে থাকা মুশকিল। তাই চোরাশিকারিদের দমন জরুরি।’




