ঘুষ.সাইট
ঘুষের শীের্ষ ভূমি ও পাসপোর্ট অফিস
- ১৬ দিনে ঘুষের অভিযোগ ১৮ হাজার ৪২৯টি
- বড় ঘুষ দাবির অভিযোগই বেশি

‘ঘুষ.সাইট’ ছোট অঙ্কের চেয়ে বড় অঙ্কের ঘুষ দাবির অভিযোগই বেশি। গত ১৬ দিনে সাইটটিতে জমা পড়েছে ১৮ হাজার ৪২৯টি অভিযোগ। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ অভিযোগেই ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবির কথা জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে ঢাকা বিভাগ থেকে। দপ্তরভিত্তিক হিসাবে অভিযোগের শীর্ষে রয়েছে ভূমি ও পাসপোর্ট অফিস।
সরকারি সেবা নিতে গিয়ে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথাই উঠে এসেছে ‘ঘুষ.সাইটে’ জমা পড়া অভিযোগে। ঘুষ দেওয়ার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলোই এখন জমা হচ্ছে এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে।
গত ২১ আগস্ট চালু হওয়া ‘ঘুষ.সাইট’-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে ৩৫ শতাংশেই দাবি করা হয়েছিল বড় অঙ্কের ঘুষ— ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা। ৩১ শতাংশ অভিযোগে ১ হাজার ১ থেকে ৫ হাজার টাকা, ১৩ শতাংশে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছিল ঘুষ। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্যে আরও দেখা গেছে, ১২ হাজার ৯৪৪ জন বা ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে পরিশোধ করা হয়েছে দাবি করা ঘুষ। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ৪ হাজার ৩৩০ জন বা ২৩ শতাংশ। এখনো মীমাংসাধীন ৬ শতাংশ অভিযোগ।
সাইটটির তথ্য অনুযায়ী, চালুর পর ১৬ দিনে প্রকাশ করা হয়েছে অন্তত ১৮ হাজার ৪২৯টি অভিযোগ। এসব অভিযোগে দাবি করা ঘুষের পরিমাণ প্রায় ৫২৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা। অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গড়ে প্রতিটি অভিযোগে ঘুষের দাবি ছিল ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। তবে এসব তথ্যকে দেশে সংঘটিত ঘুষের প্রকৃত পরিমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে— এমন কোনো দাবি করা হয়নি সাইটটির পক্ষ থেকে।
অভিযোগের সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা বিভাগ। এখানে ৭ হাজার ২১২টি অভিযোগে দাবি করা ঘুষের পরিমাণ ২৮৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা। চট্টগ্রামে ৩ হাজার ৯২৫টি অভিযোগে ৯৯ কোটি ২২ লাখ, রাজশাহীতে ১ হাজার ৫৮৩টি অভিযোগে ২২ কোটি ৫৪ লাখ, খুলনায় ১ হাজার ৪৪৮টি অভিযোগে ২৪ কোটি ২ লাখ এবং রংপুরে ১ হাজার ২৯৯টি অভিযোগে ২৫ কোটি ১১ লাখ টাকা ঘুষ দাবির তথ্য রয়েছে। ময়মনসিংহে ১ হাজার ১৭১টি, বরিশালে ৯৬৬টি এবং সিলেটে অভিযোগ জমা পড়েছে ৮২৫টি।
দপ্তরভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ৫ হাজার ৯০৫টি অভিযোগ এসেছে ‘অন্যান্য সরকারি সেবা’ নিয়ে। এসব অভিযোগে দাবি করা ঘুষের পরিমাণ ২২৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ভূমি অফিস নিয়ে ৩ হাজার ৯৭৫টি অভিযোগে ৯১ কোটি ৮ লাখ, পাসপোর্ট অফিসে ২ হাজার ১৪৯টি অভিযোগে ১৯ কোটি ৯৮ লাখ এবং বিআরটিএতে ১ হাজার ৩৩৬টি অভিযোগে ২১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির কথা বলা হয়েছে।
ঘুষের দাবির অঙ্কের পাশাপাশি অভিযোগগুলোয় উঠে এসেছে দালালের দৌরাত্ম্য ও সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তির নানা চিত্র। মানিকগঞ্জের সিংগাইরের এক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, তার স্ত্রীর কেনা জমির নামজারি করতে সংশ্লিষ্ট একজন দলিল লেখক দাবি করেছেন ২০ হাজার টাকা। তাকে বলা হয়েছে, এই টাকা ‘বড় স্যারকে’ দিতে হবে, না হলে হবে না নামজারি। অথচ নামজারির সরকারি ফি ১ হাজার ২০০ টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ব্যবস্থাকে জটিল মনে করা বা পরিচয় প্রকাশের ভয় থেকে অনেকে অনলাইনে পরিচয় গোপন রেখে আগ্রহী হতে পারেন অভিযোগ জানাতে। তবে শুধু অভিযোগের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যাবে না, এমন উদ্যোগের সাফল্য। অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রকৃত দুর্নীতির চিত্র বের করা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য দেওয়া এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করাই বড় বিষয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী জানালেন, ঘুষের বিস্তার ইঙ্গিত দেয় সমাজে বিচারহীনতা, অরাজকতা ও সুশাসনের ঘাটতির। নাগরিকদের এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া সফল হতে পারে না এটি। ভুয়া অভিযোগের অপব্যবহার ঠেকানোর পাশাপাশি জরুরি দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সক্রিয় করা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
‘ঘুষ.সাইট’ তৈরির পেছনে রয়েছে উদ্যোক্তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতাও। উদ্যোক্তা শাহেদ শরিফ আহমেদের ভাষ্য, মায়ের মৃত্যুর পর তার প্রাপ্য পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষের দাবির মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। নিজের পাসপোর্ট তৈরির সময়ও হয় একই ধরনের অভিজ্ঞতা। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই নাগরিকদের ঘুষের অভিজ্ঞতা একটি জায়গায় জমা করার উদ্যোগ নেন তিনি।





