জিনের ভয় দেখিয়ে ক্ষতবিক্ষত হাত, অতঃপর ...

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘স্বামীর পরকীয়া সম্পর্ক দূর করে দেবেন’— সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন প্রলোভনে কথিত এক তান্ত্রিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন গৃহবধূ সালমা আক্তার। শুরুতে ‘হাদিয়া’ হিসেবে দেন দেড় হাজার টাকা। এরপর ‘জালালি কবুতর’ কিনতে দেন আরও সাড়ে ৩ হাজার টাকা। কিন্তু প্রতারণার ফাঁদ শেষ হয়নি তখনো। একপর্যায়ে জিনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথা বলে সালমাকে কিনতে বলা হয় পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসাল মিষ্টি। ইমু ভিডিও কলে কথিত তান্ত্রিকের নির্দেশনা অনুযায়ী সেগুলো হাতে ব্যবহার করতেই ঘটে ভয়াবহ ঘটনা। রাসায়নিক বিক্রিয়ায় গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয় সালমার বাম হাতের তালুতে।
এরপর শুরু হয় প্রতারণার দ্বিতীয় ধাপ। ক্ষত সারিয়ে দেওয়ার আশ্বাস এবং জিনের ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় আরও টাকা। শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারস্থ হন তিনি। শুধু সালমা নন, গত কয়েক মাসে একই ধরনের রাসায়নিক ক্ষত নিয়ে অন্তত ২০০ জন ভুক্তভোগী গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসা নিয়েছেন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।
এভাবেই ফেসবুকে তান্ত্রিক সেজে প্রতারণা করে আসা একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সালমার অভিযোগের সূত্র ধরেই প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে চক্রটির তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার দুজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। ভুক্তভোগী ওই নারী গত ২১ জুন খিলক্ষেত থানায় একটি মামলা করেন। মামলাটির তদন্ত করে পিবিআই।
পিবিআই জানায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘তান্ত্রিক কবিরাজ’, ‘হোসেন কবিরাজ’, ‘আসমা কবিরাজ’ ও ‘রহমত আলী কবিরাজ’ নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি এবং ইমু অ্যাকাউন্ট খুলে প্রতারণা চালাত চক্রটি। বিভিন্ন পারিবারিক, দাম্পত্য ও ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে বিশেষ করে নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করত তারা। এরপর ‘তান্ত্রিক পদ্ধতি’ বা ‘জিনের মাধ্যমে চিকিৎসা’র নামে ভুক্তভোগীদের পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসাল মিষ্টি একসঙ্গে হাতের তালু বা নাভিতে কিছুক্ষণ ধরে রাখতে নির্দেশ দেওয়া হতো। রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে ওই স্থানে সৃষ্টি হত গুরুতর ক্ষত। আর তখনই শুরু হতো ভয় দেখানোর পালা।
বলা হতো, জিনের কারণে এমন হয়েছে। আবার ওই জিনের মাধ্যমেই ক্ষত সারিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে আদায় করা হতো টাকা। টাকা পাওয়ার পর একপর্যায়ে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিত চক্রটি।
তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা পিবিআইর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শিবলী নোমান বলছিলেন, ‘সালমা আক্তারের মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করা হয়। গত ২৪ জুলাই কুমিল্লার চান্দিনার হাড়িখোলা বিলের বাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েত (২৪) ও মাহে আলমকে (২৭) গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন নোয়াখালীর সুধারাম থানার পূর্ব এওজবালিয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় হাসান আলীকে (২০)। তাদের কাছ থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও একাধিক সিম কার্ড জব্দ করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি স্বীকার করে তারা। পরে অহিদ মিয়া এবং হাসান আলী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।’
পিবিআই এসআইএন্ডও উত্তরের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফজলে এলাহীর ভাষ্য, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতারণা নয়। সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিয়ার বানিয়ে সংঘবদ্ধভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এই চক্রের কার্যক্রম। আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণে প্রতারণার অর্থের একটি অংশ অহিদ মিয়ার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মাহে আলম নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রে নিবন্ধিত বিকাশ সিম ব্যবহার করে চক্রটিকে সহায়তা করতেন।
তিনি বলছিলেন, চক্রটির প্রতারণার জাল দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ভারতের মাটিতেও বিস্তৃত। ভারতীয় মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সেখানকার মানুষের সঙ্গেও একই কৌশলে প্রতারণা করত তারা। বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও তদবিরের নামে গুগল পের মাধ্যমে অর্থ নিয়ে পরে হুন্ডির মাধ্যমে তা দেশে এনে আত্মসাৎ করা হতো। ভুয়া তান্ত্রিক সেবার প্রচারণা ছড়িয়ে দিতে নিয়মিত বিজ্ঞাপনও দিত চক্রটি। বিভিন্ন অ্যাড এজেন্সির মাধ্যমে ফেসবুক পেজ বুস্ট করে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করত।
পিবিআইর তদন্তে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ধর্মীয় বিশ্বাস, কুসংস্কার ও মানুষের আবেগকে পুঁজি করে প্রতারণাকারী সংঘবদ্ধ চক্রটির অনেক সাধারণ মানুষের ক্ষতি করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একই ধরনের ক্ষত নিয়ে অন্তত ২০০ জন ভুক্তভোগী চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য স্বাভাবিক ঘটনা নয়। অর্থাৎ সালমার ক্ষতবিক্ষত হাত কোনো একক ঘটনার গল্প নয়। অন্ধ বিশ্বাস আর প্রতারণার এই খেলায় এরই মধ্যে বহু মানুষ নাম লিখিয়েছেন। প্রতারণার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন শরীরে।






