বিআরটিএতে দালাল সিন্ডিকেট, ‘প্যাকেজ’ ভিত্তিক চলছে টাকা আদায়

ফাইল ছবি
লাইসেন্স করতে গিয়ে বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনে দাঁড়ালেই যেন শুরু হয় আরেক পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় লিখিত, মৌখিক বা ব্যবহারিক নয়— পাস করতে হয় দালাল, দীর্ঘ লাইন, ধীরগতি আর অনিশ্চয়তার বাধা। সরকারের ডিজিটাল সেবার যুগেও যেখানে কয়েকটি ক্লিকেই আবেদন করার কথা, সেখানে অনেকের কাছে লাইসেন্স পাওয়ার সবচেয়ে সহজ পথ হয়ে উঠেছে দালালের হাত ধরা। আর স্মার্ট কার্ডের তীব্র সংকটকে পুঁজি করে সেই দালাল চক্র এখন গড়ে তুলেছে কোটি টাকার বাণিজ্য।
সরকারি ফি কয়েক হাজার টাকা হলেও ‘নিশ্চিত’ ও ‘দ্রুত’ লাইসেন্সের নামে দালালদের দাবি ১০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এমনকি পরীক্ষায় না বসেই লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ারও প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে একটি চক্র। লাইসেন্স পাওয়ার পথে প্রথম ধাপই যেন এক অদৃশ্য সিন্ডিকেট, যার নাম ‘দালাল’।
দেশে বৈধভাবে গাড়ি চালাতে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) ড্রাইভিং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন ঘরে বসেই অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই অনলাইন প্রক্রিয়াই অনেক সাধারণ মানুষের কাছে জটিল ও দুর্বোধ্য। ফলে আবেদন করতে কিংবা পরবর্তী ধাপ সম্পন্ন করতে তাদের ছুটতে হয় বিআরটিএ কার্যালয়ে। আর সেখানেই শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা, ধীরগতির সেবা এবং নানা ভোগান্তি।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয় ঘুরে দেখা যায়, সকাল ৯টা বাজতেই লাইসেন্স আবেদন, নবায়ন, মালিকানা পরিবর্তন, রুট পারমিটসহ বিভিন্ন কাজে আসা শত শত মানুষের ভিড়। কিন্তু কাজের গতি অত্যন্ত ধীর। অনেকের অভিযোগ, নির্ধারিত নিয়মে কাজ করতে গেলে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। দ্রুত সেবা পেতে দালালের দ্বারস্থ হওয়া যেন অলিখিত নিয়ম।
এই সুযোগে বিআরটিএ কার্যালয়ের আশপাশে গড়ে ওঠা কম্পিউটারের দোকানগুলোও হয়ে উঠেছে দালাল চক্রের অংশ। অধিকাংশ আবেদনকারী নিজেরা অনলাইনে আবেদন করতে না পারায় এসব দোকানে ভিড় করেন। বিআরটিএর নির্ধারিত ফি অনুযায়ী, কারের লাইসেন্সের প্রাথমিক আবেদন ফি ৫১৮ টাকা এবং কার ও মোটরসাইকেল উভয়ের জন্য ৭৪৮ টাকা। কিন্তু শুধু আবেদনপত্র পূরণ করতেই গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে এক হাজার টাকা।
শুধু আবেদন নয়, ই-লার্নার থেকে শুরু করে মূল স্মার্ট কার্ড হাতে তুলে দেওয়ার পুরো ‘প্যাকেজ’ও বিক্রি করছেন তারা। কত দ্রুত লাইসেন্স প্রয়োজন, তার ওপর নির্ভর করছে টাকার অঙ্ক। কেউ ১০ হাজার, কেউ ১৫ হাজার, আবার কেউ ৩০ হাজার কিংবা ৪০ হাজার টাকায় ‘জরুরি’ লাইসেন্সের নিশ্চয়তা দিচ্ছেন।
মিরপুর বিআরটিএ-সংলগ্ন একটি কম্পিউটার দোকানের কর্মী মো. মেহরাব জানিয়েছেন, স্বাভাবিকভাবে আবেদন করলে স্মার্ট কার্ড পেতে তিন থেকে ছয় মাস, কখনো তারও বেশি সময় লাগে। তবে ১০ হাজার টাকায় এক থেকে দুই মাসের মধ্যে কাজ করে দেওয়ার দাবি করেন তিনি। ১৫ হাজার টাকা দিলে আরও দ্রুত হবে বলেও জানান। তবে সশরীরে দক্ষতা পরীক্ষায় পাস করানোর নিশ্চয়তা তিনি দেননি।
অন্যদিকে, কার্যালয়ে আসা এক আবেদনকারীর দাবি, ভেতরে এমন লোক আছেন, যারা পুরো প্রক্রিয়াই নিশ্চিত করে দেন। এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে আবেদনকারী সেজে বিআরটিএ ভবনে প্রবেশ করেন এই প্রতিবেদক।
দায়িত্বরত আনসার সদস্য সজীব আলীর কাছে সহজে লাইসেন্স পাওয়ার উপায় জানতে চাইলে তিনি ১ নম্বর ভবনের পাশের গ্যারেজে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তির কাছে পাঠান। আনসারের কথা বলতেই ওই ব্যক্তি নিজেকে ভেতরের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে জরুরি লাইসেন্সের জন্য ৪০ হাজার টাকা দাবি করেন।



