আগাম প্রস্তুতিতে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কমেছে ৪০ শতাংশ: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় চার মাস আগে থেকে পরিকল্পনা গ্রহণ, সমন্বিত পদক্ষেপ ও চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ফলে এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। আক্রান্তদের মধ্যে আগে প্রতি হাজারে পাঁচজনের মৃত্যু হলেও বর্তমানে তা কমে তিনজনে নেমে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।
আজ মঙ্গলবার বাংলা একাডেমিতে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক এক সেমিনার শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা জানান প্রতিমন্ত্রী।
সরকারের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, এবার সরকার আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় চার মাস আগেই সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রায় দুই মাস আগে পূর্বাভাস দিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে, যা নভেম্বর পর্যন্ত চলতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালের ভয়াবহ পরিস্থিতির তুলনায় এবার ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ও রোগের তীব্রতা কম। তবে সরকার বর্তমান পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখছে না। প্রতিটি মৃত্যুই বেদনাদায়ক। ডেঙ্গুর সংক্রমণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তুলে ধরে ডা. মুহিত জানান, প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রেড ক্রিসেন্ট, স্কাউটসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রায় এক হাজার তরুণ স্বেচ্ছাসেবককে নিয়ে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। এ ছাড়া প্রতি শনিবার দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে। স্কুল-কলেজ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমেও দেশব্যাপী এ কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, এবার ঢাকা ও খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেশি। সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, তাদের দল এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মশা ও লার্ভা ধ্বংসে দিনরাত কাজ করছেন।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নাগরিকদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুহিত বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ বা পুলিশের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ঢাকা এখন বহুতল ভবনের শহর। নিরাপত্তাজনিত কারণে অনেক সময় পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া এসব ভবনে প্রবেশ করতে পারেন না। অথচ ভবনের পার্কিংয়ের পেছনে কিংবা ফেলে রাখা ইলেকট্রনিক পণ্যের কার্টনে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হচ্ছে।
নাগরিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘নিজের ঘর, ছাদ, বারান্দার টব এবং ভবনের নিচতলা নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন। আপনার এই সচেতনতাই আপনার বাবা-মা ও সন্তানকে ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষিত রাখবে।’
ডেঙ্গুর সম্ভাব্য টিকা নিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তার ভাষ্য, বিশ্বে বর্তমানে দুই থেকে তিনটি ডেঙ্গুর টিকা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে প্রায় ৩০টি দেশে মূলত বেসরকারি পর্যায়ে ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। সম্প্রতি ভারতেও একটি টিকা বেসরকারিভাবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তবে বাংলাদেশে টিকার ব্যাপক ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোটি কোটি মানুষের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার বিষয়টি এখানে জড়িত। তাই বিজ্ঞানীদের মতামত, ক্লিনিক্যাল তথ্য এবং দেশের মানুষের ওপর টিকার কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
তিনি আরও জানান, টিকা চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করার উপায় নয়। এটি মূলত ভবিষ্যতের সুরক্ষার বিষয়। পাশাপাশি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে জাপানের উদ্ভাবিত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরীক্ষামূলক প্রয়োগ নিয়েও সরকার কাজ করছে।
ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের ৬৪ জেলার মেডিকেল কলেজ ও জেলা সদর হাসপাতালের প্রায় দুই হাজার চিকিৎসককে ডেঙ্গু চিকিৎসার বিষয়ে পুনঃপ্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, এ প্রশিক্ষণের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে চিকিৎসাসেবায় এবং মৃত্যুহার কমিয়ে রাখতে সহায়তা করেছে।



