হৃদরোগের চিকিৎসায় বদলাচ্ছে ভাবনা
নন-ইনভেসিভ চিকিৎসায় সাওল পদ্ধতির ভূমিকা

ডা. জাবিদ-উল কাদির জোয়ার্দ্দার
হৃদরোগ সবসময় স্পষ্ট সংকেত দিয়ে আসে না। অনেক সময় বুকের অস্বস্তি, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গও অবহেলিত থেকে যায়। বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬-এর বার্তা— ‘Heart disease can hide in plain sight: don’t miss a beat’— তাই হৃদয়ের সংকেত চেনা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো চিকিৎসার ওপর নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নন-ইনভেসিভ হার্ট কেয়ার, জীবনযাপন পরিবর্তন এবং ‘সাওল পদ্ধতি’ নিয়ে আলোচনা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
হৃৎপিণ্ড আমাদের শরীরের এমন একটি অঙ্গ, যার কাজ আমরা সচরাচর অনুভব করি না— যতক্ষণ না কোনো সমস্যা দেখা দেয়। প্রতিটি মুহূর্তে নিরবচ্ছিন্নভাবে স্পন্দিত এই অঙ্গটির সুস্থতার ওপর নির্ভর করে পুরো শরীরের রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ। অথচ ব্যস্ত জীবন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও অতিরিক্ত ওজনের মতো ঝুঁকিগুলো ধীরে ধীরে হৃদরোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬-এ তাই বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনের বার্তা— হৃদরোগ অনেক সময় চোখের সামনেই লুকিয়ে থাকতে পারে; তার লক্ষণকে অবহেলা না করাই সচেতনতার অন্যতম প্রধান শর্ত। বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনের মতে, কার্ডিওভাসকুলার রোগের বড় একটি অংশ প্রতিরোধযোগ্য বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
হৃদরোগের চিকিৎসা মানেই কি শুধু স্টেন্ট বা বাইপাস?
হৃদরোগের চিকিৎসা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি সরল ধারণা রয়েছে— ধমনিতে সমস্যা হলে হয় স্টেন্ট, নয়তো বাইপাস। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
করোনারি হৃদরোগের ধরন, উপসর্গের তীব্রতা, রক্তনালির অবস্থা, অন্যান্য রোগ এবং সামগ্রিক ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধ, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, শারীরিক কর্মকাণ্ড ও কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
American Heart Association ও American College of Cardiology-এর ২০২৩ সালের Chronic Coronary Disease Guideline-এ রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে Cardiac Rehabilitation-ও উল্লেখযোগ্য উপকার দিতে পারে।
অর্থাৎ আধুনিক হৃদযত্নে প্রশ্নটি শুধু— ‘কোন চিকিৎসা করা হবে?’ —এতটুকু নয়; বরং ‘কোন রোগীর জন্য কোন চিকিৎসা, কখন এবং কীভাবে সবচেয়ে উপযুক্ত?’ —সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নন-ইনভেসিভ হার্ট কেয়ার কেন আলোচনায়?
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নন-ইনভেসিভ বলতে সাধারণভাবে এমন পদ্ধতিকে বোঝানো হয়, যেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শরীরের ভেতরে কোনো যন্ত্র প্রবেশ করানো হয় না।
হৃদরোগ ব্যবস্থাপনায় এমন একটি আলোচিত পদ্ধতি হলো Enhanced External Counter Pulsation বা EECP। এতে রোগীর পা ও নিম্নাঙ্গে বিশেষ ইনফ্ল্যাটেবল কাফ ব্যবহার করা হয়। হৃৎস্পন্দনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাফগুলো নির্দিষ্ট সময়ে চাপ প্রয়োগ ও মুক্ত করে। এর মাধ্যমে রক্তসঞ্চালনের গতিশীলতায় প্রভাব সৃষ্টি এবং হৃৎপিণ্ডের রক্তপ্রবাহের ওপর উপকারী প্রভাব তৈরির চেষ্টা করা হয়।
২০২৩ সালের AHA/ACC Chronic Coronary Disease Guideline-এ বলা হয়েছে, Chronic Coronary Disease-এর সঙ্গে Refractory Angina রয়েছে এবং অন্য চিকিৎসার বিকল্প নেই— এমন নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে উপসর্গ উপশমের জন্য EECP বিবেচনা করা হয়।
‘সাওল পদ্ধতি’: নন-ইনভেসিভ চিকিৎসার সঙ্গে জীবনযাপন
বাংলাদেশে নন-ইনভেসিভ হার্ট কেয়ারের আলোচনায় ‘সাওল পদ্ধতি’ একটি পরিচিত নাম। এই পদ্ধতির মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো— হৃদরোগ ব্যবস্থাপনাকে শুধু একটি চিকিৎসা বা একটি যন্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে চিকিৎসা, জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক কর্মকাণ্ডকে সমন্বিতভাবে দেখার চেষ্টা। সাওল পদ্ধতির সঙ্গে EECP-এর ব্যবহার বিশেষভাবে আলোচিত। পাশাপাশি Lifestyle Modification বা জীবনযাপন পরিবর্তনকেও এই মডেলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির একটি বিশেষ দিক হলো, রোগীকে চিকিৎসার নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা হিসেবে না দেখে তার নিজের হৃদস্বাস্থ্যের ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা।
কারণ হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক সময় একদিনে তৈরি হয় না। বছরের পর বছর উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনযাত্রার পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদি হৃদযত্নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চিকিৎসা হবে রোগীকেন্দ্রিক
একই ধরনের হৃদরোগে আক্রান্ত হলেও সব রোগীর চিকিৎসা এক নয়। কারও ক্ষেত্রে ওষুধ ও জীবনযাপন পরিবর্তন যথেষ্ট হতে পারে, কারও ক্ষেত্রে Invasive Intervention প্রয়োজন হতে পারে; আবার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে Non-invasive Therapy বিবেচিত হতে পারে। এ কারণে আধুনিক হৃদরোগ ব্যবস্থাপনায় Patient-centered Care বা রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। AHA/ACC Guideline-ও Shared Decision-making এবং Team-based, Patient-centered Care-এর ওপর জোর দিয়েছে।
সাওল পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা তাই শুধু একটি নির্দিষ্ট থেরাপির আলোচনা নয়; বরং হৃদরোগের চিকিৎসায় নন-ইনভেসিভ পদ্ধতি, জীবনযাপন পরিবর্তন এবং রোগীর সক্রিয় অংশগ্রহণ— এই বৃহত্তর ধারণার অংশ হিসেবেও বিষয়টি দেখা যেতে পারে।
লেখক: কনসালট্যান্ট, সাওল হার্ট সেন্টার, বাংলাদেশ



