ঢাকায় প্রতি তিন শিশুর একজন চোখের সমস্যায় আক্রান্ত
- ডিজিটাল স্ক্রিনে গড়ে কাটায় প্রায় ৫ ঘণ্টা
- কম ঘুমায় শিশুরা
- প্রায়ই মাথাব্যথায় ভোগে ৮০ শতাংশ শিশু
- আক্রান্ত হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক রোগে
- চোখের যত্নে মেনে চলতে হবে ‘২০-২০-২০’ নিয়ম

ঢাকা শহরের প্রতি তিনজনে এক শিশু চোখের সমস্যায় আক্রান্ত। স্কুলগামী এই শিশুরা ডিজিটাল স্ক্রিনে দিনে গড়ে সময় দেয় প্রায় ৫ ঘণ্টা। প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমায় এসব শিশুরা। স্থূলতা, মাথাব্যথাসহ নানান শারীরিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তারা। পাশাপাশি খারাপ হচ্ছে এসব শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যও।
চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ওঠে এসেছে এসব তথ্য। গবেষণাটি করা হয়েছে ২০২২-২০২৪ সালে ঢাকার তিনটি বাংলা মাধ্যম ও তিনটি ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া ৪২০ শিশুর ওপর। এসব শিশুদের বয়স ছিল ৬ বছর থেকে ১৪ বছর।
গবেষণাটি করতে গবেষকেরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু সহজ প্রশ্নপত্র ব্যবহার করে কথা বলেছেন শিশুদের সঙ্গে। পাশাপাশি করেছেন শিশুদের শারীরিক পরীক্ষা। এ সময় শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের সময়, ঘুমের হিসাব নিয়েছেন তারা। এসব শিশুদের ওজন স্বাভাবিক কিনা এবং তাদের আচরণ বা মানসিক স্বাস্থ্যে কোনো সমস্যা আছে কিনা— খতিয়ে দেখা হয়েছে তাও।
গবেষণার তথ্য বলছে, চোখের সমস্যায় ভুগছে এক-তৃতীয়ংশেরও বেশি শিশু। এছাড়া প্রায়ই মাথাব্যথায় ভোগে ৮০ শতাংশ শিশু। গড়ে মাত্র ৭.৩ ঘণ্টা ঘুমায় তারা। অথচ এই বয়সের শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার ঘুম।
নয় বছরের আকমাম রহমান প্রায়ই স্কুলের ডায়েরি লিখত না। এ নিয়ে স্কুল থেকে এসেছে অভিযোগ। রাগ করেছে বাবা-মা। পরে জানা গেল, বোর্ডের লেখা ঠিকঠাক দেখতে পায় না আকমাম। চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চোখের পরীক্ষা শেষে দেখা গেল, আকমাম দূরের জিনিস ঠিকমতো দেখতে পায় না। এরপর থেকে চশমা ব্যবহার করছে সে।
আকমামের অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আকমাম ছোটবেলা থেকে মোবাইল ও ল্যাপটপে সময় কাটাতো। অতিরিক্ত স্ক্রিন দেখার ফলেই আকমাম চোখের অসুখে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
গবেষণার তথ্য বলছে, প্রতি ৫ জন শিশুর মধ্যে ৪ জন শিশু প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে, যা শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সময়ের চেয়ে বেশি। শিশুরা স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার এবং গেমিং ডিভাইসে দিনে গড়ে প্রায় ৪.৬ ঘণ্টা সময় কাটায়।
গত ২৩ বছর ধরে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের গ্লুকোমা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এম. এম. এইচ. মনির। তিনি বলছেন, এখন শিশুরা স্ক্রিন বেশি দেখছে। মায়োপিয়া, শুষ্ক চোখের (ড্রাই আই) রোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তারা। আগের তুলনায় শিশুরা চোখের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে বেশি আসছে বলেও জানান এই চিকিৎসক।
গবেষণায় অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক উল্লেখ করেছেন গবেষকেরা। তারা বলছেন, রাতে স্ক্রিন ব্যবহার মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে ব্যাহত করে ঘুমের স্বাভাবিক চক্রকে। এছাড়া দীর্ঘক্ষণ বসে থাকায় শারীরিক পরিশ্রম ও খেলাধুলা কমে গিয়ে বাড়ায় স্থূলতার ঝুঁকি। অতিরিক্ত সময় স্ক্রিন ব্যবহার চোখের ওপর সৃষ্টি করে চাপ। এতে মাথাব্যথা হয় এবং কমে যায় মনোযোগ।
এই গবেষণার প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআরবির অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, বাবা-মায়ের উচিত শিশুদের দেরিতে ঘুমানো, বারবার মাথাব্যথা বা চোখের অস্বস্তি, অস্বাভাবিক খিটখিটে মেজাজ বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, বাইরের খেলাধুলার প্রতি অনীহা অথবা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলোকে উপেক্ষা না করা। কারণ এগুলো অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের লক্ষণ হতে পারে, যা সন্তানদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ফেলতে শুরু করেছে প্রভাব।
আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, ডিজিটাল ডিভাইস এখন জীবনের অংশ হলেও শিশুদের সুস্থতার জন্য প্রয়োজন সীমা নির্ধারণ করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, স্কুলগামী শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম দিনে ২ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।
শিশুদের বিতর্ক, দলবদ্ধভাবে পড়াশোনা, লাইব্রেরিতে যাওয়া এবং টবের গাছের যত্ন নেওয়ার মতো ভালো ও সৃজনশীল কাজে অংশ নিতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাহমিদ আহমেদ।
শিশুদের চোখের যত্নে ‘২০-২০-২০’ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে হবে। তবেই কমতে পারে চোখের জটিলতা।










