আক্রান্ত ১,৮৬,২৯৬
হামে মৃত্যু ৯৯৯, ঝুঁকিতে লাখো আক্রান্ত
- এখনো হাসপাতালে ভর্তি আছে ৪৫,৪৪৬
- আক্রান্তরা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতার ঝুঁকিতে
- আক্রান্ত অনেক শিশুর নতুন রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হামে আক্রান্ত হয়ে গত ৭ এপ্রিল মারা যায় তিন মাস বয়সী আয়াত। মৃত্যুর আগে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের এই শিশুটির শেষ ১৫ দিন কাটে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। সেখান ভর্তি হওয়ার আগে উচ্চমাত্রার জ্বর এবং নিউমোনিয়া নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছিল স্থানীয় হাসপাতালে। কিন্তু অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরে ভর্তি করা হয়েছিল শিশু হাসপাতালে। তবে বাঁচানো যায়নি তাকে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে হামে মারা যাওয়া ছয় মাসের কম বয়সী প্রথম শিশু আয়াত। তাকে বাঁচাতে চিকিৎসকরা বাড়তি মনোযোগ দিয়েছিলেন। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের এক চিকিৎসক বলেছেন, ‘আয়াতের মৃত্যু হাম হলেও ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা সুরক্ষিত থাকার তত্ত্বে প্রথম আঘাত হানে। ম্যাটারন্যাল ইমিউনিটির ঘাটতির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে।’
শুধু তাই নয় হামের চিকিৎসা দেন এমন কয়েকজন চিকিৎসক বলছেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা প্রথম থেকেই কম থাকে। আক্রান্ত হওয়ার পর সেটি আরও কমে নানা শারীরিক জটিলতা তৈরি করে। হামে আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশ নিউমোনিয়ায় ভুগে মারা যায়। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু তীব্র ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েও মারা যায়।
চলতি বছরের মার্চ থেকে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু। গত ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামসংক্রান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। তাদের তথ্য বলছে, গত ছয় মাসে দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯৯৯ জনের। মৃতদের অধিকাংশই শিশু। প্রতিরোধযোগ্য হামে সবচেয়ে বেশি মারা গেছে দুই বছরের কম বয়সী শিশুরা। হামে সর্বাধিক মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে।
বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেছেন, ‘হামে প্রতিটি িশশুর মৃত্যুই দুঃখজনক। মহামারী বিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী, হামে যত শিশুর মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে, প্রকৃত মৃত্যু তার চেয়ে অন্তত তিন গুণ বেশি। তারা হাসপাতালে আসেনি, স্বীকৃত কোনো সেবাকেন্দ্রে চিকিৎসা নেয়নি, ফলে তাদের শনাক্ত করা যায়নি।’
এদিকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে মারা যাওয়া কয়েক শিশু একই সঙ্গে হামের ভাইরাস এবং এডিনো ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল। যাতে জটিলতা বেড়ে গিয়ে সেসব শিশুর মৃত্যু ঠেকানো যায়নি। এই হাসপাতালের পরিচালক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেছেন, ‘পুষ্টিহীনতা, মায়ের বুকের দুধ কম পাওয়ার পাশাপাশি শিশুদের মায়েরাও হামের টিকার আওতায় না আসায় হামে আক্রান্ত শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। এ ছাড়া একই সঙ্গে একাধিক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে জটিল শারীরিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। তখন এসব শিশুর শরীরে আর কোনো ওষুধ কাজ করে না। এভাবে শিশুরা মারা যাচ্ছে।’
ভুগছে লাখো শিশু: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য আরও বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ছয় মাসে হামে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৮৬ হাজার ২৯৬ জন। এর মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৮৩১ জন। অর্থাৎ এখনো হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে ৪৫ হাজার ৪৪৬ শিশু। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ২৩৬ শিশু। মারা গেছে দুজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিরোধযোগ্য রোগ হামে একটি মৃত্যুও গ্রহণযোগ্য নয়। হামের মৃত্যু নিয়ে গণমাধ্যমের কারণে কিছুটা আলোচনা আছে। হাম-পরবর্তী জটিলতা নিয়ে তেমন কোনো কাজ হচ্ছে না। অথচ কয়েক লাখ শিশু হাম-পরবর্তী সাময়িক ও দীর্ঘমেয়াদি নানা জটিলতায় ভুগছে।
গত সোমবার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল হামের জন্য বিশেষায়িত ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, সাত মাসের শিশু আয়ান ইসলামকে মা শরীর মুেছ দিচ্ছেন। হাড় জিরজিরে শরীরের আয়ানের হাম ভালো হয়েছে কিছুদিন আগে। এখন হাম-পরবর্তী জটিলতা নিউমোনিয়ায় ভুগছে। রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে অবশেষে গত ১৯ আগস্ট থেকে এই হাসপাতালে আছে। শুরুর ১৫ দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ছিল। এখন ওয়ার্ডে দিয়েছে।
আয়ানের মা সানজানা ইসলাম বলেছেন, ‘এ পর্যন্ত আয়ানের চিকিৎসায় খরচ হয়েছে প্রায় ৭ লাখ টাকা। তাতে দুঃখ নেই। কিন্তু আয়ান ভয়াবহ অপুষ্টির শিকার। ডাক্তার বলেছেন, এই ধকলে ওর শরীরে বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’
বারডেম জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট আবিদ হোসেন মোল্লা বলেছেন, ‘হামের ভাইরাস মস্তিষ্ক, ফুসফুস, লিভার, চোখ, কানসহ নানা অঙ্গে জটিলতা সৃষ্টি করে। সবচেয়ে বেশি হয় নিউমোনিয়া। ভিটামিন-এ ঘাটতি হওয়ার কারণে চোখের পানি কমে যাওয়া, রাতকানা, কর্নিয়া ঘোলা হতে পারে। কান পাকতে পারে। মুখের ভেতর ঘা হতে পারে। ডায়রিয়া, শরীরে পানিশূন্যতা ও প্রস্রাব কমে যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেছেন, যথাযথ চিকিৎসা এবং ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার, আমিষের জোগান দেওয়া গেলে এ সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব। তবে এগুলো করা না গেলে অপুষ্টিজনিত কারণে শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। শিশুটি খর্বাকায় হতে পারে, চোখে কম দেখতে পারে, এমনকি অন্ধও হতে পারে, কানে সমস্যা হতে পারে, ব্রেনে প্রদাহসহ দীর্ঘমেয়াদি খিঁচুনি রোগ হতে পারে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক এই প্রধান আরও বলেছেন, ‘আগে কখনো এভাবে হামের ব্যাপ্তি ঘটেনি। ফলে হাম-পরবর্তী জটিলতা ভালোভাবে বুঝতে অন্তত এক হাজার শিশুকে দুই বছর ফলোআপ রাখা দরকার। এটি পাঁচ বছর করা গেলে সবচেয়ে ভালো ফল মিলবে।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বলেছেন, ‘হামের কারণে সামনের দিনগুলোয় শিশুরা অন্যান্য রোগে বেশি আক্রান্ত হবে। হাম আক্রান্ত রোগীর হাম-পরবর্তী ইমিউন অ্যামনেশিয়ার কারণে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় স্মৃতি নষ্ট হয়ে যায়। এতে যে শিশুরা হামে আক্রান্ত হওয়ার আগে ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, পোলিও, টিবি, ধনুষ্টংকারসহ বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল, তারা আবার নতুন করে এসব রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এর পাশাপাশি হাসপাতালের বিল বহন করতে গিয়ে পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।





