অপেক্ষাগারে গন্ধে টেকা দায়

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পাশের অপেক্ষাগার। রাত বাড়ার সঙ্গে সেখানে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। কেউ মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে বসে রয়েছেন, কেউ আধশোয়া হয়ে দীর্ঘ রাত কাটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কারও হাতে ভাঁজ করা প্রেসক্রিপশন, কেউ মোবাইল ফোনের আলোয় ওষুধের তালিকা মিলিয়ে দেখছেন। কারও অপেক্ষা চিকিৎসক দেখানোর। কিন্তু এসবের মধ্যে উগলে উঠছে অন্য এক বাস্তবতা— তীব্র দুর্গন্ধ।
অপেক্ষাগারের পাশের খোলা ড্রেন থেকে ভেসে আসছে প্রস্রাব, ময়লা পানি ও পচা কিছুর গন্ধ। সেই গন্ধে অনেককে নাক চেপে বসে থাকতে হচ্ছে। কেউ কিছুক্ষণ পরপর বাইরে গিয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। কিন্তু বসার আর কোনো জায়গা না থাকায় ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন একই জায়গায়।
সরেজমিন দেখা যায়, অপেক্ষাগারের পাশ ঘেঁষেই খোলা ড্রেন। সেখানে জমে রয়েছে কালচে পানি। বাতাসের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ। অথচ তার পাশেই রাত কাটাতে হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের।
অপেক্ষাগারের এক কোণে বসে ছিলেন ৬০-৭০ বছর বয়সী এক দম্পতি। ড্রেনের ঠিক পাশেই তাদের অবস্থান। বৃদ্ধ হায়দার আলী প্রথমে ঠিকমতো শুনতে পাননি প্রশ্ন। পরে কাছে গিয়ে কথা বললে তার আক্ষেপ, ‘কী করমু, বসার জায়গা তো পাই না।’
কিছুক্ষণ পর দুর্গন্ধ সহ্য করতে না পেরে ধীরে ধীরে উঠে যান তিনি। পাশে বসা তার স্ত্রী খায়তুন বেগম ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘এত বড় হাসপাতালে এমন অবস্থা! রোগী নিয়া আইছি, এখন নিজেরাই অসুস্থ হইয়া যামু।’
অপেক্ষাগারের আরেক পাশে মাদুর বিছিয়ে বসে ছিলেন সিরাজগঞ্জ থেকে আসা মাওলানা আলতাফ মাহমুদ। স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগছেন। ডাক্তার দেখানোর পর রাত কাটানোর জায়গা না পেয়ে অপেক্ষাগারেই বসে আছেন তারা। এক হাতে প্রেসক্রিপশন, অন্য হাতে নাক চেপে তিনি বলছিলেন, ‘প্রশাসন এগুলো দেখে না। শত মানুষ এখানে বসে আছে। কেউ জায়গা পায় না, তাই বাধ্য হইয়া এই গন্ধের মধ্যেই বসে থাকে। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়।’
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালের ভেতরে পরিচ্ছন্নতা রক্ষার কথা বলা হলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় এ অবস্থা।
অপেক্ষাগারের পাশেই দায়িত্বে ছিলেন আনসার সদস্য মাহিন। দীর্ঘদিন ধরে এখানে কাজ করছেন তিনি। দুর্গন্ধের প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি বললেন, ‘আমি এখানে এসেছি আড়াই থেকে তিন মাস হলো। আসার পর একবার মনে হয় পরিষ্কার করতে দেখছিলাম।’
ওয়ার্ড মাস্টার মো. আইয়ুব আলীকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমরা তো পরিষ্কার করি, মেডিসিনও দিই।’ দুর্গন্ধ তারপরও কেন— এ প্রশ্নে বললেন, ‘আপনারা অভিযোগ দিছেন, এটা পরিষ্কার করে দেওয়া হবে।’ এ বিষয়ে জিজ্ঞাসার জবাবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলছিলেন, মানুষ হাসপাতালে আসে সুস্থ হওয়ার আশায়। কিন্তু সেখানে এসে যদি দুর্গন্ধ, ময়লা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অনেকেই হাসপাতালের ভেতরে থুথু ফেলছেন, ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে রাখছেন। চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদি প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের বাড়ির মতো মনে না করেন, তাহলে এ ধরনের সমস্যা থেকেই যাবে। শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বাইরে কী ঘটছে, সেটিও দেখতে হবে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
গতকাল বুধবার এই হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ইমার্জেন্সি ইউনিটের ঠিক পাশেই পড়ে রয়েছে অনেক দিনের বিভিন্ন বর্জ্য। সেখানে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকাও কষ্টকর। অথচ ওই পথ দিয়েই প্রতিনিয়ত যাতায়াত করছেন রোগী, স্বজন ও হাসপাতালের কর্মীরা। ময়লার স্তূপের বিপরীত পাশে ছোট্ট একটি দোকান বসিয়েছেন এজাজ মিয়া। দোকানের পাশে রাখা ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতে দেখা যায় তাকে। তিনি বললেন, এখানে প্রতিদিনই ময়লা জমে থাকে। পরিষ্কার করতে আসে, আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই আগের মতো হয়ে যায়। গরমে গন্ধ আরও বেশি হয়।
ওয়ার্ড মাস্টার আবুল বাসার আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘এটি হাসপাতালের বাইরের অংশ হওয়ায় হয়তো গুরুত্ব কম দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জনবল সংকটও রয়েছে।’
তবে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়লেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দীন। ‘আপনারা জানাইছেন, ভালো করছেন। আপনারা না জানালে আমরা জানব কীভাবে? আগামীর সময়কে এ কথা বলার পর তিনি তার পিএসকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘সবাইকে শোকজ করেন। বসে টাকা খাবে, পরিষ্কার করবে না।’




