ঈদের আনন্দ ফিরেছে রাইকার হাসিতে

ছবি: আগামীর সময়
ঈদের দিন অন্য শিশুদের মতো নতুন জামা পরে ঘুরতে বের হওয়া হয়নি রাইকার। পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির বদলে থাকতে হয়েছে হাসপাতালের বেডে। ১৫ দিন হামের সঙ্গে লড়াই শেষে এখন কিছুটা সুস্থ। আর তার সুস্থতার খবরেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরেছে পরিবারে।
ঈদের এক সপ্তাহ আগে হঠাৎই জ্বর আসে রাইকার। প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে হলেও কয়েক দিনের মধ্যে দেখা যায় হামের লক্ষণও। পরিবারের সদস্যরা নিয়ে যান গ্রামের এক চিকিৎসকের কাছে। অবস্থার উন্নতি না হলে শরণাপন্ন হন নোয়াখালীর মাইজদী শহরের এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের। সেখান থেকে পরামর্শ দেওয়া হয় ঢাকায় নিয়ে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার।
আর তখনই পরিবারের জন্য শুরু হয় এক অনিশ্চয়তার যাত্রা। ঈদের প্রস্তুতি, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে উৎসবের পরিকল্পনা— সবকিছু ছাপিয়ে একমাত্র চিন্তা হয়ে দাঁড়ায় ছোট্ট রাইকার সুস্থতা। ঈদের দিন রাতেই তাকে ভর্তি করা হয় মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে।
রাইকার বাবা কামাল হাসান সৌদি আরবের একটি দোকানে কর্মরত। মেয়ের অসুস্থতার খবর দূর দেশে বসে শুনলেও তাৎক্ষণিক ফিরতে পারেননি। ফলে হাসপাতালে মেয়েকে নিয়ে ছুটতে হয়েছে মা উম্মে হাবিবা প্রীতি ও নানা নুরুল ইসলামকে।
নুরুল ইসলাম বললেন, ‘রাইকা আমার মেয়ের ঘরের একমাত্র নাতি। তার অসুস্থতা শোনার পর আমি ঈদের আগেই মেয়েকে বাসায় চইলা আসতে বলছিলাম। মেয়ে বলছিল ঈদের পর আসবে। কিন্তু এর মধ্যেই নাতিটার শরীর আরও বেশি খারাপ হইয়া যায়। তাই ঈদের দিন বিকালেই রওনা দিয়া চইলা আসি মহাখালী।’
হাসপাতালের ওয়ার্ডে তাদের কয়েকটি দিন কেটেছে উদ্বেগ আর অপেক্ষার মধ্যে। কখন কমবে জ্বর, কখন কমবে শরীরের র্যাশ, কখন আবার স্বাভাবিকভাবে খাওয়াদাওয়া শুরু করবে—এসব প্রশ্নই ঘুরপাক খেয়েছে পরিবারের সদস্যদের মনে।
রাইকার মায়ের অবস্থা ছিল আরও করুণ। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদ কাটানোর পরিবর্তে তার সময় কেটেছে হাসপাতালের বেডের পাশে বসে। সন্তানের একটু সুস্থতার লক্ষণ দেখলেই যেন নতুন করে আশা জেগেছে তার মনে।
ভর্তি হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যেই সুস্থ হতে শুরু করে রাইকা। ধীরে ধীরে কমে আসে জ্বর, স্বাভাবিক হতে থাকে শারীরিক অবস্থাও। এখন প্রস্তুতি চলছে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার।
টানা ছয় দিন নাতির ওষুধপত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে বলে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি নুরুল ইসলাম। চোখে-মুখে স্বস্তির ছাপ নিয়ে বললেন, ‘নাতিডা এখন একটু সুস্থই। ডাক্তাররে জিগাইলাম দেশে যাইতে পারুম কি না? ডাক্তার কাইলকা যাইতে বলছে। সুস্থ হওয়ার পর রাইকার হাসিখুশি চেহারা দেখতে শান্তিই লাগতাছে। এখন সুস্থ অবস্থায় নাতিডারে বাড়িতে নিয়া যাইতে পারলেই শান্তিতে একটু ঘুমাইতে পারুম।’
দীর্ঘ উদ্বেগ, হাসপাতালের করিডরে কাটানো নির্ঘুম রাত আর আনন্দহীন ঈদের পর রাইকার সুস্থতা যেন নতুন প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে পরিবারে। যে ঈদ শুরু হয়েছিল আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা দিয়ে, সেটিই এখন শেষ হচ্ছে রাইকার সুস্থতার হাসিতে।
নতুন জামা, সেমাই কিংবা উৎসবের আয়োজন নয়, এবার রাইকার সুস্থতাই যেন তার পরিবারের সবচেয়ে বড় ঈদ উপহার।




