হাম আতঙ্কের মধ্যেই চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু

সংগৃহীত ছবি
দেশ যখন হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ডেঙ্গু। একদিকে শিশুদের প্রাণ কাড়ছে হাম, অন্যদিকে বর্ষা শুরুর আগেই ৫৫ জেলায় ছড়াচ্ছে এডিস মশাবাহিত রোগ। দুই সংক্রামক রোগের একযোগে বিস্তার দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর সৃষ্টি করছে বাড়তি চাপ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে আসছে বর্ষায় পরিস্থিতি নিতে পারে আরও ভয়াবহ রূপ।
তাদের শঙ্কা, শিশু হাসপাতাল ও সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর হাসপাতালে বাড়তে পারে রোগীর ভিড়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু সরকারের উদ্যোগ নয়, স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন এবং সাধারণ মানুষকে কাজ করতে হবে একসঙ্গে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৭ জন। এ নিয়ে চলতি বছর মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৮৪ জনে। যার মধ্যে ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ পুরুষ এবং নারী ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের। অন্যদিকে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও ছয় শিশুর। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৩৩৪ জন।
ডেঙ্গুর সম্ভাব্য প্রকোপ মোকাবিলায় দেশ জুড়ে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে সরকার। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, চিরুনি অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং বিশেষ চিকিৎসা প্রটোকল চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, হামের চেয়েও বেশি কার্যকরভাবে ডেঙ্গু মোকাবিলা করতে চায় সরকার। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ফিল্ড হাসপাতাল। পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জন্য দেওয়া হয়েছে বিশেষ নির্দেশনা। মোট শয্যার অন্তত ১০ শতাংশ সংরক্ষণ করতে হবে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য। চিকিৎসকদের নেওয়া যাবে না কোনো ভিজিট ফি। ডেঙ্গু পরীক্ষায় ছাড় দিতে হবে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। রোগীদের শুধু দিতে হবে ওষুধ ও খাবারের খরচ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের পর অনেক জায়গায় পশুর রক্ত ও বর্জ্যের কারণে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। নালা-নর্দমা এবং নির্মাণাধীন ভবনের পাশে জমে রয়েছে পানি। বাংলামোটর ও কাঁঠালবাগান এলাকার ছোট ছোট গর্তে জমেছে বৃষ্টির পানি।
ডেমরার বাসিন্দা শরিফুর ইসলাম জানালেন, মশার যন্ত্রণায় ঘুমানো যায় না। মাঝেমধ্যে ওষুধ ছিটালেও কোনো লাভ হয় না।
মেসে থাকা চাকরিজীবী শাওন ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘ঈদের ছুটি শেষে এসে দেখছি মশার তীব্র উপদ্রব। অথচ চারদিকে মশা নিধনের কোনো স্প্রে করতে দেখিনি। কামড় দিলে যে কী হবে, সে আতঙ্কে আছি।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. তাজউদ্দিন শিকদার জানালেন, পাঁচ বছর ধরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে ধারাবাহিকভাবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা না বাড়লে এ প্রবণতা কমানো সম্ভব নয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলছিলেন, ‘শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এজন্য জনগণকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক আন্দোলন গড়তে হবে।’ তিনি দ্রুত রোগ শনাক্তের জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক বিনামূল্যে পরীক্ষার ব্যবস্থা করার ওপর জোর দেন। এ বছর ডেঙ্গুর সেরোটাইপ পরিবর্তন হলে মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়তে পারে— জানালেন এমন শঙ্কার কথাও।
মুশতাক হোসেন আগামীর সময়কে বলছিলেন, বৃষ্টির মৌসুম শুরুর আগেই ডেঙ্গুর বিস্তার দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তিনি মনে করেন, পাড়া-মহল্লায় স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ঘরের ভেতরে-বাইরে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। দ্রুত রোগ শনাক্তের জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক টেস্টের জরুরি ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা খরচের ভয়ে চিকিৎসা নিতে পিছিয়ে না যায়।




