অভাব জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর

সকাল সকাল ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে ভিড় নারীদের। কারও প্রয়োজন জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি, কেউ নিতে চান জন্মনিয়ন্ত্রণের ইনজেকশন, কেউবা কনডম। কিন্তু অপেক্ষার পরও ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। কোথাও নেই বড়ি, কোথাও নেই কনডম, আবার কোথাও মাসের পর মাস সরবরাহ বন্ধ জন্মনিয়ন্ত্রণের ইনজেকশন। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দিচ্ছে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার। এতে বাড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, সঙ্গে গোপন গর্ভপাতের ঝুঁকিও।
একসময় বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিনামূল্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার যে পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থা দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ছিল সাফল্যের প্রতীক, দীর্ঘ সরবরাহ সংকটে এখন সে ব্যবস্থাই মাঠপর্যায়ে কার্যত অচল।
দেশের বিভিন্ন জেলা ঘুরে এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী ও সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর সরবরাহ সংকট চলছে পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত মিলছে না কনডম, খাওয়ার বড়ি কিংবা জন্মনিয়ন্ত্রণ ইনজেকশন। অনেক এলাকায় অন্তঃসত্ত্বাদের প্রয়োজনীয় প্রাথমিক ওষুধও সরবরাহ করা হচ্ছে না নিয়মিত।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, এরই মধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহারের ওপর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, ১৫-৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের জন্মনিরোধক ব্যবহারের হার ২০১৯ সালে ছিল ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে। একই সময়ে আধুনিক জন্মনিরোধক পদ্ধতির চাহিদা পূরণের হারও ৭৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে নেমেছে ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে বছরে গর্ভধারণ করেন প্রায় ৫৩ লাখ নারী। এর মধ্যে ৩৩ থেকে ৩৪ লাখ জন্ম দেন সন্তান। বাকি প্রায় ১৯ লাখের গর্ভধারণ শেষ হয় গর্ভপাতের মাধ্যমে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর দীর্ঘমেয়াদি সংকট অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ এবং অনিরাপদ গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে আরও।
মাঠপর্যায়ে এ সংকটের প্রভাব এখন স্পষ্ট। রাজবাড়ী, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ঘাটতি চলছে— খোঁজ নিয়ে এমনটিই জানতে পেরেছেন আগামীর সময়ের প্রতিনিধিরা।
রাজবাড়ী জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২ লাখ ৪১ হাজার ৯৬৮ সক্ষম দম্পতির মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই নির্ভরশীল সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ওপর। কিন্তু দুই বছর ধরে ইউনিয়ন পর্যায়ে কনডম, বড়ি ও ইনজেকশনের সংকট চরমে। একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন টাঙ্গাইল জেলার পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারাও। জেলার ১২ উপজেলায় থাকা ৮১টি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রেও নিয়মিত সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে বলে রয়েছে অভিযোগ।
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কাঠামোর মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন ১২৭ জন পরিবারকল্যাণ সহকারী, ৪৩ জন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শক এবং ২৭ জন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা। এসব জনবল বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে তাদের হাতে সরবরাহযোগ্য সামগ্রী না থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে পুরো কার্যক্রম।
মাঠপর্যায়ের পরিবারকল্যাণ সহকারীরা বলছেন, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি গেলেও অনেক সময় তাদের হাতে থাকে না বিতরণের মতো কোনো সামগ্রী। ফলে সেবা কার্যক্রম সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে শুধু পরামর্শ প্রদানে।
রাজবাড়ীর বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, নির্ধারিত দিনে অনেক নারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে। কোথাও বড়ি নেই, কোথাও নেই কনডম বা ইনজেকশন। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারকল্যাণ সহকারীরা শুধু পরামর্শ দিয়েই ফিরছেন বাড়ি। ফলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে রোগীর চাপও বেড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে সেবা না পেয়ে মানুষ এখন বাধ্য হয়ে নির্ভর করছেন উপজেলা কিংবা জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার ওপর।
সরকারি পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী, যারা দীর্ঘদিন ধরে নির্ভরশীল বিনামূল্যের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ওপর। কিন্তু সরবরাহ সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন তারাই।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজার থেকে নিয়মিত কনডম, বড়ি কিংবা ইনজেকশন কেনার সামর্থ্য না থাকায় বহু দম্পতি বন্ধ করে দিচ্ছে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ছে, বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোতে।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির এক গৃহবধূ জানালেন, দীর্ঘদিন সরকারি বড়ির ওপর নির্ভর করলেও সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকিতে পড়েছেন। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরলেন জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া এলাকার এক কিশোরী মা। তিনি জানালেন, কনডম ও বড়ির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নিতে পারেননি বিকল্প কোনো ব্যবস্থা। কম বয়সে মাতৃত্ব ছিল তার পরিকল্পনার বাইরে।
নাম প্রকাশ করতে চান না মাঠপর্যায়ের এমন এক পরিবারকল্যাণ সহকারী বললেন, ‘মাসের পর মাস কোনো সরবরাহ নেই। মানুষ মনে করছে আমরা সামগ্রী দিচ্ছি না। অথচ বাস্তবে আমাদের কাছেই কিছু আসে না।’
‘অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বাড়ছে। গোপন গর্ভপাতের ঘটনাও আগের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে’— যোগ করলেন তিনি।
সংকটের প্রভাব এখন দেখা যাচ্ছে মাতৃ স্বাস্থ্যসেবায়ও। অনেক এলাকায় অন্তঃসত্ত্বারা নিয়মিত পাচ্ছেন না আয়রন ট্যাবলেট; কিংবা প্রয়োজনীয় প্রাথমিক ওষুধ।
এক অন্তঃসত্ত্বা আক্ষেপ করে জানালেন, আগে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে পাওয়া যেত আয়রন ট্যাবলেটসহ কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধ। এখন শুধু প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয়, বাকি সবই কিনতে হয় বাইরে থেকে। এতে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর।
রাজবাড়ী জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক আবু নছর মোহাম্মদ কদর উদ্দীন জানালেন, আগে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা নিয়মিত সরবরাহ করতেন জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ বন্ধ থাকায় এখন সম্ভব হচ্ছে না তা দেওয়া। দরিদ্র মানুষের বড় একটি অংশ এসব কিনতে পারছেন না বাজার থেকে।
তবে সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠার আশ্বাস দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘আগামী সপ্তাহে আমরা সরবরাহ বাড়াতে পারব। আমরা পর্যাপ্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পেতে যাচ্ছি।’
চিকিৎসক সংযুক্তির বিষয়ে মন্ত্রী জানালেন, অনেক সংযুক্তি বাতিল হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে আরও বাতিল করা হবে। যারা উচ্চতর ডিগ্রির সুযোগ পাচ্ছেন, তাদের সংযুক্তি থাকবে।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থার সরবরাহ চেইন দুর্বল থাকলে এর প্রভাব শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কিশোরী মাতৃত্ব, মাতৃস্বাস্থ্যঝুঁকি, অপুষ্টি এবং দরিদ্র পরিবারের অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে আরও।
একসময় যে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মডেল হিসেবে পরিচিত ছিল, দীর্ঘ সরবরাহ সংকট ও মাঠপর্যায়ের দুর্বলতায় এখন সে ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ছে নতুন করে।






