বাস-ট্রাকে ভাড়া বাড়তি, নিত্যপণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী
- নতুন বাস ভাড়া প্রতি কিমি দূরপাল্লায় ২.৪০ টাকা, মহানগরে ২.৭০ টাকা
- পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া প্রতি ট্রিপে বেড়েছে ২ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ধাক্কায় বাড়ছে বাস-ট্রাকের ভাড়া; নিত্যপণ্যের বাজারেও কমছে না অস্বস্তি। ফলে প্রতিদিনের খরচে বাড়তি চাপ। জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর দূরপাল্লার বাস ভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে ঢাকা থেকে বিভিন্ন রুটে যাত্রীকে গুনতে হবে বাড়তি ভাড়া। শহরের ভেতরেও বাড়ছে যাতায়াতের খরচ।
বিভিন্ন রুটে পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়াও প্রতি ট্রিপে বেড়েছে ২ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। যশোরে সবজির পাইকারি মোকাম থেকে ঢাকায় পাঁচ টনের ট্রাকে সবজি নিতে ১ হাজার টাকা আর বেনাপোল থেকে ঢাকায় সাড়ে ১২ টনের ট্রাকে পণ্য নিতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি সাড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। আবার কুষ্টিয়ার মোকাম থেকে খাতুনগঞ্জে ট্রাকে পণ্য আনার ভাড়া ৩২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৪০ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পণ্য পাঠাতে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বাজারে ভোজ্য তেল, আটা, ময়দা, রসুন, তেজপাতা, বেগুনসহ বিভিন্ন পণ্যের বাড়তি দাম মিলিয়ে চাপে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার। পথচলা থেকে রান্নাঘর— জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি খাতেই বাড়তি খরচের এই চাপ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন হিসাবকে আরও কঠিন করে তুলছে।
জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে ভাড়া বৃদ্ধির হার চূড়ান্ত করা হয়েছে। নতুন ভাড়া কার্যকর হবে প্রজ্ঞাপন জারির মধ্য দিয়ে। তবে গতকাল রাত ৮টায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।
এর আগে গত সোমবার বিআরটিএর ভাড়া সমন্বয় কমিটি দূরপাল্লার বাসে ২০ পয়সা এবং মহানগরের বাসে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে সেই প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দুই ক্ষেত্রেই ১৭ পয়সা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। কেউ বেশি ভাড়া নিলে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে; এমনকি রুট পারমিট বাতিল ও জরিমানার ব্যবস্থাও করা হবে। জনস্বার্থ বিবেচনায় আলোচনার মাধ্যমে সরকার বাস ভাড়া যৌক্তিক হারের চেয়ে কম রাখার চেষ্টা করেছে।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, সাধারণত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ১ টাকা বাড়লে বাস ভাড়া কিলোমিটারে ১ পয়সা বাড়ানোর একটি প্রচলিত হিসাব রয়েছে। সে হিসাবে এবার ২০ টাকা বাড়ায় পরিবহন মালিকরা কিলোমিটারে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর দাবি করেছিলেন। এর সঙ্গে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও বাসের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়ার বিষয়টিও তারা তুলে ধরেছিলেন। তবে সরকার সব বিষয় বিবেচনা করে ২০ পয়সার পরিবর্তে ১৭ পয়সা ভাড়া নির্ধারণ করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
গত এপ্রিলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাস ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। তখন দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসের ভাড়া ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৫৩ পয়সা হয়েছিল। এবার মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে আবারও বাস ভাড়া বাড়ছে।
গত রবিবার রাতে সরকার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। নতুন দরে ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে বেড়ে ১৩৫, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ এবং পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা করা হয়েছে। নতুন দাম গত সোমবার রাত ১২টা থেকে কার্যকর করা হয়।
বর্তমান ভাড়ার সঙ্গে নতুন প্রস্তাবিত ভাড়ার তুলনা করলে দূরপাল্লার বাসযাত্রায় যাত্রীদের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব রুটভেদে ভিন্ন হলেও ভাড়া নির্ধারণ ও আদায়ের কারণে যাত্রীকে বাড়তি গুনতে হবে ৩২ থেকে ৫২ টাকা। অর্থাৎ ভাড়া সমন্বয়ের পর দূরপাল্লার যাত্রীদের জন্য যাত্রাপথের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে বাড়তি ব্যয়ের চাপও তৈরি হবে।
সবচেয়ে বেশি বাড়বে ঢাকা-রংপুর রুটে। বর্তমানে এ পথে ভাড়া ৭১৫ টাকা হলেও নতুন হিসাবে তা দাঁড়াবে ৭৬৭ টাকা। অর্থাৎ একবারের যাত্রায় বাড়তি দিতে হবে ৫২ টাকা। এরপর ঢাকা-সিলেট রুটে ৫৮০ থেকে বেড়ে হবে ৬২৪ টাকা, অর্থাৎ বাড়তি ৪৪ টাকা। ঢাকা-রাজশাহী রুটে ৫৭৯ থেকে ৬২১ টাকা হওয়ায় যাত্রীকে ৪২ টাকা বেশি দিতে হবে। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ৫৫২ থেকে বেড়ে ৫৯৩ টাকা হলে বাড়তি খরচ হবে ৪১ টাকা।
অন্যদিকে ঢাকা-খুলনা রুটে বর্তমান ৫৮২ থেকে বেড়ে হবে ৬২১ টাকা, বাড়তি ৩৯ টাকা। ঢাকা-বরিশাল রুটে ৪৫৪ থেকে বেড়ে ৪৯০ হওয়ায় যাত্রীর খরচ বাড়বে ৩৬ টাকা। তুলনামূলকভাবে কম দূরত্বের ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটেও ভাড়া ৪১৫ থেকে বেড়ে ৪৪৭ টাকা হবে; অর্থাৎ যাত্রীকে দিতে হবে ৩২ টাকা বেশি।
নিত্যপণ্য ঊর্ধ্বমুখী: ব্যাগ হাতে কারওয়ান বাজারে ঢুকেছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফুল ইসলাম। সঙ্গে ছিল সীমিত টাকা। ভাবনা ছিল, হয়তো গত সপ্তাহের মতোই শেষ করতে পারবেন কেনাকাটা। কিন্তু এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরতেই বদলে যেতে থাকে হিসাব। এক কেজি তেল, কিছু সবজি, মসলা আর ডিম কিনতেই ফুরিয়ে গেল টাকা। কিন্তু তালিকার অনেক কিছুই তখনো কেনা বাকি। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরিফুল বলছিলেন, ‘কীভাবে চলব, বুঝতে পারছি না। টাকা তো তেমন পাই না। প্রতিদিনই বাড়ছে কোনো না কোনো জিনিসের দাম। ঢাকা শহরে থাকাটাই আমাদের জন্য কষ্টকর।’
আরিফুলের এই হিসাব এখন অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের নিত্যদিনের বাস্তবতা। মাসের শুরুতে বেতন হাতে পাওয়ার পর যে বাজারের তালিকা তৈরি হয়, মাসের শেষদিকে কাটছাঁট করতে হয় তা। অর্থাভাবে বাদ পড়ে অনেক প্রয়োজনীয় ও পুষ্টিকর খাবারের নাম। মাছ-মাংসের পরিমাণ কমছে, সবজির তালিকা ছোট হচ্ছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের চেয়ে কম পরিমাণে পণ্য কিনে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন ক্রেতারা।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) প্রকাশিত বাজারদর বিশ্লেষণ করে নিত্যপণ্যের বাজারে পাওয়া গেছে এমন চিত্র। বাজারে সব পণ্যের দাম একসঙ্গে বাড়েনি। কয়েকটির দাম এক বছর আগের তুলনায় কমেছে। তবে আটা-ময়দা, ভোজ্য তেল, রসুন, তেজপাতা, বেগুনসহ বেশ কিছু পণ্যের বাড়তি দাম চাপ তৈরি করছে সামগ্রিক বাজার খরচে।
টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মিরপুর-৬, মোহাম্মদপুর টাউন হল, নিউ মার্কেট, রামপুরা ও মহাখালী বাজারে বর্তমানে খোলা আটা কেজিপ্রতি ৫০ টাকা এবং প্যাকেট আটা ৬০-৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খোলা ময়দা ৭০ টাকা এবং প্যাকেট ময়দা ৮০-৯০ টাকা। এক মাস আগে প্যাকেট ময়দার দাম ছিল ৭৫-৮৫ টাকা। রান্নাঘরের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য ভোজ্য তেলের দামেও স্বস্তি নেই। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ২০৪ টাকা, দুই লিটার ৪১০ টাকা এবং পাঁচ লিটার এক হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক বছর আগে এসব তেলের দাম ছিল যথাক্রমে ১৮৮-১৯০, ৩৭৫-৩৭৮ ও ৮৯০-৯২০ টাকা।
মসলার বাজারে রসুন ও তেজপাতার দামও বাড়তি। আমদানি করা রসুন ১৮০-২০০ টাকা এবং দেশি রসুন ১০০-১২০ টাকা কেজি। তেজপাতা বিক্রি হচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকা কেজি, যেখানে এক বছর আগে দাম ছিল ২০০-২২৫ টাকা। সবজির বাজারে ঢুকলেও একই প্রশ্ন— কী কিনবেন, আর কী বাদ দেবেন? কাঁচা মরিচ ১২০-১৬০, বেগুন ৯০-১২০ ও শসা ৫০-৮০ টাকা কেজি। তবে এক বছর আগে কাঁচা মরিচের দাম আরও বেশি ছিল, ১৮০-২২০ টাকা। বেগুনও ছিল ৫০-১০০ টাকা কেজি। বাজারে কিছু পণ্যে স্বস্তি ফিরলেও সেই স্বস্তি সামলাতে পারছে না সব পণ্যের বাড়তি দামের চাপ।
চাল ও ডালের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল। সরু চাল ৭০-৮৫ টাকা, মাঝারি চাল ৫৫-৬৫ টাকা এবং মোটা চাল ৫০-৫৫ টাকা কেজি। মসুর ডাল বড় দানা ৯৫-১০০, মাঝারি ১১৫-১২০ ও ছোট দানা ১৫০-১৬০ টাকা কেজি। মাছ-মাংসের বাজারে অবশ্য হিসাব আরও কঠিন। রুই মাছ ৩০০-৪৫০, গরুর মাংস ৭৮০-৮৫০, খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ঊর্ধ্বে। ব্রয়লার মুরগি ১৮০-২০০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬০০-৭৫০ টাকা কেজি। ফার্মের ডিমও বিক্রি হচ্ছে ৪৮-৫৫ টাকা হালি। তবে বিক্রেতাদেরও রয়েছে নিজেদের হিসাব।
কারওয়ান বাজারের মামা-ভাগিনা কিচেন মার্কেটের বিক্রেতা রবিন মিয়া বললেন, ‘মুরগি যে দামে নিছি, সেই দামেই বিক্রি করছি। গতকাল সোনালি ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা এবং ব্রয়লার ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা ছিল।’ ক্রেতার চোখে দাম বেশি হলেও খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, তারা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন না; পাইকারি বাজারে যে দামে পণ্য কিনছেন, তার সঙ্গে সামান্য লাভ যোগ করেই বিক্রি করছেন।
এদিকে, সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে ক্রেতাদের সামনে পড়ছে অন্য বাস্তবতা। আয় নির্দিষ্ট, কিন্তু বাজারের খরচ নির্দিষ্ট নয়। একদিকে তেল-মসলা-সবজির দাম, অন্যদিকে মাছ-মাংস-ডিমের খরচ— সব মিলিয়ে মাসের বাজারের বাজেট বারবার ভেঙে যাচ্ছে। চিনি ১১০-১১৫, আয়োডিনযুক্ত লবণ ৪০-৪২ ও গুঁড়া দুধ ৮৩০-৯৬০ টাকা কেজি। এসব পণ্যের দামও পরিবারের নিয়মিত ব্যয়ের অংশ। ফলে একটি পণ্যের দাম কমলেও অন্য কয়েকটি পণ্যের বাড়তি দাম সেই সুবিধা অনেকটাই
মুছে দিচ্ছে।



