বাড়ছে অজ্ঞাত লাশ, তদন্ত গতিহারা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নদীতে ভেসে উঠছে লাশ। সড়কের পাশে, রেললাইনের ধারে, ঝোপঝাড়ে কিংবা নির্জন স্থানেও মিলছে মরদেহ। কোনোটি পচন ধরা, কোনোটি ক্ষতবিক্ষত, কোনোটি বস্তাবন্দি, আবার কোনো কোনো মরদেহের হাত-পা বাঁধা। পুলিশ উদ্ধার করছে, ময়নাতদন্ত হচ্ছে, মামলা বা অপমৃত্যুর নথি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু পরিচয় মিলছে না বহু মরদেহের। শুধু তাই নয়, পরিচয় অজানা থাকার পাশাপাশি অজানাই থেকে যাচ্ছে মৃত্যুর কারণ বা হত্যাকাণ্ড হলে খুনির পরিচয়।
আগামীর সময়ের অনুসন্ধানে ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত তিন বছর আট মাসে দেশে ১ হাজার ৯৭৮টি ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ মরদেহ উদ্ধারের তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৩৬২টি, ২০২৪ সালে ৫১০টি, ২০২৫ সালে ৬৪১টি এবং চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৪৬৫টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। সে হিসাবে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭৭ শতাংশ। তদন্তের অগ্রগতি না হওয়ায় মৃত্যুর পরও শেষ হচ্ছে না স্বজনদের অনন্ত অপেক্ষার।
নৌ-পুলিশের তথ্য বলছে, তাদের উদ্ধার করা ৩০ শতাংশের বেশি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। সবশেষ তিন মাসের হিসাবেও এর প্রতিফলন রয়েছে। চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত নৌ-পুলিশ উদ্ধার করেছে ১৭১টি মরদেহ। এর মধ্যে ১২৩টির পরিচয় শনাক্ত হলেও ৪৮টি মরদেহ এখনো অশনাক্ত। এই ১৭১টির মধ্যে ১৫টি ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে। যার মধ্যে এখনো শনাক্ত হয়নি সাতজনের পরিচয়। অন্যদিকে ১৪০টি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় হয়েছে অপমৃত্যুর মামলা। এর মধ্যে ৪১ জনের পরিচয় মেলেনি। ফলে নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর শুধু মৃত্যুর কারণ নয়, মৃত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নৌ-পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. রেজাউল করিম আগামীর সময়কে বললেন, ‘অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের পর সর্বাত্মক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয়। তবে কাজটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হলেও চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই।’
‘নদী থেকে উদ্ধার হওয়া অনেক মরদেহ অর্ধগলিত বা গলিত অবস্থায় থাকে। ফলে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। তখন নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য, থানায় করা সাধারণ ডায়েরি এবং স্বজনদের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। এর পরও কিছু মরদেহের পরিচয় কোনোভাবেই নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না’— যোগ করলেন নৌ-পুলিশপ্রধান।
ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদী থেকে গত ১৯ সেপ্টেম্বর আলাদা ঘটনায় দুজনের মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। সেদিন দুপুরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে বেপারিঘাট বরাবর মাঝ নদী থেকে আনুমানিক ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির বিবস্ত্র মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নৌ-পুলিশের এএসআই বাবুল মিয়ার ধারণা, মরদেহটি উদ্ধারের দুই থেকে তিন দিন আগে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গে।
একই দিন দলেশ্বর খেয়াঘাট দিয়ে নৌকায় পারাপারের সময় স্থানীয়রা পানিতে আরেকটি মরদেহ ভাসতে দেখে পুলিশকে খবর দেন। পরে হাসনাবাদ নৌ-পুলিশ সেটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায় হাসপাতালে। দুটি মরদেহের কোনো পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত ঢাকায় ২ হাজার ১০৪টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৪৯০টি, ২০২৪ সালে ৫৭০টি, ২০২৫ সালে ৬৪৪টি এবং ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪০০টি। অধিকাংশই দাফন করা হয় জুরাইন ও রায়েরবাজার কবরস্থানে।
রাজধানীতে এক দিনেই তিনটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার হয় গত ১২ সেপ্টেম্বর। এর মধ্যে আদাবরের হক্কারপাড় খাল থেকে এক কিশোরীর খণ্ডিত মরদেহ আর জাতীয় ঈদগাহ ও হাইকোর্ট মাজারসংলগ্ন ফুটপাত থেকে উদ্ধার হয় দুজনের মরদেহ। কিশোরীর আঙুলের ছাপ এনআইডি ডেটাবেসে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি কোনো তথ্য। এ ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে। অন্য দুজনের একজনের পরিচয় শনাক্ত (নাম জুয়েল) হলেও অন্য মরদেহটি কার, তা জানা যায়নি আজও।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাগত দক্ষতার ঘাটতি, সমন্বিত ডেটাবেসের অভাব, অপরাধপ্রবণ এলাকায় প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, পুলিশের তথ্যদাতার ঘাটতি, আধুনিক ডিএনএ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা না থাকা এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের দুর্বলতার কারণে সম্ভব হচ্ছে না অনেক মরদেহ স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। অজ্ঞাতনামা মরদেহের পরিসংখ্যানকে শুধু অপরাধের সংখ্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। এটি নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় দক্ষতা দেখাতে পারেনি।’
পরিচয় না মিললে থেকে যায় রহস্যও: তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানালেন, হত্যার পর পরিচয় গোপন করতে নদী, খাল কিংবা নির্জন স্থানে মরদেহ ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। তবে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ মানেই হত্যা নয়। দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে মৃত্যু, আত্মহত্যা, অসুস্থতা কিংবা অন্যান্য কারণেও পরিচয়হীন মরদেহ উদ্ধার হতে পারে। রেললাইন থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের অনেক ঘটনাই অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হয়। আবার তদন্তে কোনো কোনো ঘটনায় হত্যার আলামতও পাওয়া যায়। হাত-পা বাঁধা, শরীরে আঘাতের চিহ্ন, বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার, মাথাবিহীন বা দেহের অংশবিশেষ পাওয়ার মতো ঘটনায় তদন্তের গতিপথ ভিন্ন হয়ে যায়। তাই অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের সংখ্যা দিয়ে সরাসরি হত্যাকাণ্ড বা অন্য কোনো অপরাধের সংখ্যা নির্ধারণের সুযোগ নেই। তবে প্রতিটি মরদেহের পরিচয়, মৃত্যুর কারণ এবং তদন্তের অগ্রগতি আলাদাভাবে অনুসরণ জরুরি।
পচে যায় মুখ, নষ্ট হয় আঙুল, কমে যায় শনাক্তের সুযোগ: নদী, খাল, বিল কিংবা ডোবা থেকে উদ্ধার করা মরদেহ দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে দ্রুত পচে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মুখমণ্ডল হয়ে যায় বিকৃত, আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়। কোথাও হাত-পা বিচ্ছিন্ন বা দেহের অংশবিশেষ পাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ কারণে ছবি, আঙুলের ছাপ, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য কিংবা অন্যান্য প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিচয় শনাক্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তখন ডিএনএ পরীক্ষা এবং নিখোঁজদের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন থানায় নিখোঁজের ঘটনায় হওয়া সাধারণ ডায়েরি (জিডি), হাসপাতাল ও মর্গের তথ্য, পুলিশি তদন্তের তথ্য, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য এবং ডিএনএ-সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় যাচাই করা না গেলে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়।
দাফনের পর আরও কঠিন শনাক্তকরণ: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, কোনো লাশের ওয়ারিশ পাওয়া না গেলে বা পরিচয় শনাক্ত না হলে প্রয়োজনীয় আলামত সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ দাফনের আগে শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া যতটা সম্ভব সম্পন্ন করা জরুরি। দাফনের আগে যদি মরদেহের ছবি, ডিএনএ নমুনা, আঙুলের ছাপ, পোশাক ও অন্যান্য আলামত যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় এবং কবরের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নথিভুক্ত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে পরিচয় শনাক্তের সুযোগ থাকে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে উদ্ধার হয় ৩৬২টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ। পরের বছর তা বেড়ে ৫১০ এবং ২০২৫ সালে দাঁড়ায় ৬৪১টিতে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই উদ্ধার হয়েছে ৪৬৫টি মরদেহ। তিন বছরের ব্যবধানে সংখ্যাটি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানের প্রতিটি ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। মৃত্যুর কারণ আলাদা করে তদন্ত করাই প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে পারে।
উদ্ধার হওয়া লাশের পরিচয় আজানা থেকে যাওয়ার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়াকে উদ্বেগজনক মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মো. সাইদুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, ‘অজ্ঞাতপরিচয় লাশের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকা উদ্বেগের বিষয়। একটি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত না হওয়া মানে শুধু একটি তদন্ত আটকে যাওয়া নয়, একটি পরিবারও তার স্বজনের ভাগ্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা।’





