থানার খাতায় কমছে অপরাধ, বাস্তব উল্টো
- টার্গেট করে ওত পেতে থাকে সশস্ত্র দল
- হয়রানি এড়াতে থানায় যান না বেশিরভাগ ভুক্তভোগী

ছবি : এ আই
রাজধানীর কলাবাগানের মাজার গলির একটি ফ্ল্যাটে দিনদুপুরে চুরি হয় গত ৮ জুলাই। খোয়া যায় দুই লাখ টাকার মালামাল। যদিও থানায় মামলা করেননি ভুক্তভোগী আব্দুল মোমিন।
তার ভাষ্য, থানায় অভিযোগ করতে গেলে উল্টো জর্জরিত হতে হবে প্রশ্নবাণে। আসামি ধরার জন্যও গুনতে হবে টাকা। তারপর আদালতে চক্কর। উকিল ধরো, তাকেও টাকা দাও। বিচার পেতে বছরের পর বছর পার। চাকরি বাদ দিয়ে আদালতে ধরনা দেওয়ার সময় কোথায়?
মোমিনের মতো এমন অসংখ্য ভুক্তভোগী থানা পর্যন্ত যান না। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে চুরি-ছিনতাইয়ের চিত্র নিম্নমুখী হলেও বাস্তব চিত্র উল্টো।
চলতি বছরে আব্দুল মোমিনের মতো ভুক্তভোগী অন্তত এক ডজন চুরি-ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনার তথ্য রয়েছে আগামীর সময়ের হাতে। এসব ঘটনায় মোমিনের মতো ভুক্তভোগীরা কেউই থানার দরজায় পা রাখেননি।
দুটি ঘটনায় অনলাইনে মালামাল হারানোর তথ্য অবহিত করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। বেশিরভাগ ছিনতাইয়ের ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ তা রেকর্ড করে না। মালামাল হারানো বা খোয়া যাওয়ার কথা উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরি জমা রেখে তাদের বিদায় করা হয়। এ কারণে পুলিশের খাতায় চুরি-ডাকাতি-ছিনতাইয়ের পরিসংখ্যান কমলেও বাস্তব চিত্র উল্টো।
জানা গেছে, রাজধানী থেকে জেলা শহর পর্যন্ত বিস্তৃত এ ধরনের অপরাধের নেটওয়ার্ক। সশস্ত্র ছিনতাইকারীদের হামলায় দিনদুপরে হরহামেশাই সর্বস্ব হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অস্ত্র নিয়ে দলবদ্ধ হামলা করা হচ্ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে করা হচ্ছে লুট। গভীর রাতে নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মূল্যবান সামগ্রী। ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের অর্থ তুলে ফেরার পথেও হামলে পড়ছে ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারী চক্র। এমন ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘যেসব অপরাধ ঘটছে, তার অধিকাংশই শনাক্ত হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। অপরাধের প্রবণতা বর্তমানে নিম্নমুখী। ভেঙে পড়া ও মনোবল হারানো পুলিশকে ধীরে ধীরে আবার কার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। পুলিশ এখন বিভিন্ন মামলায় তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে।’ যেকোনো অপরাধের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের নির্দ্বিধায় থানায় গিয়ে অভিযোগ করার পরামর্শও দিলেন তিনি।
পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫-এর আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে ডাকাতির মামলা হয়েছে ৩২৮টি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫৬টিতে। দস্যুতার মামলা ৯৬০ থেকে কমে হয়েছে ৯০৪টি। সিঁধেল বা সংঘবদ্ধ চুরির মামলা ১ হাজার ৬৫৯ থেকে কমে ১ হাজার ৫৯১টিতে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে সাধারণ চুরির মামলা। ৫ হাজার ১১৩টি থেকে তা নেমে এসেছে ৪ হাজার ৮০৮টিতে।
তবে বাংলাদেশ পুলিশের নিজস্ব ক্রাইম ভিকটিমাইজেশন সার্ভের তথ্য বলছে, সংঘটিত অপরাধের প্রায় ৭৩ শতাংশ ভুক্তভোগী পুলিশি ঝামেলা ও বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় থানামুখী হন না। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে যত মামলা দেখা যায়, বাস্তবে অপরাধের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পরিসংখ্যানেও এ ধরনের অপরাধের পারদ নিম্নগামী। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ডাকাতি, ছিনতাই ও চুরির ঘটনায় মোট ৮৭৫টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে চুরির ঘটনায় ৬৭৫ ও ডাকাতির মামলা ২২টি। আর ছিনতাই বা দস্যুতার মামলা হয়েছে মাত্র ১৭৮টি।
গত ৯ আগস্ট উত্তরায় একটি ফিলিং স্টেশনের ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দিতে যাওয়ার সময় সশস্ত্র একটি দল গাড়ি থামিয়ে টাকা লুট করে পালিয়ে যায়। ৩০ আগস্ট দুপুর ২টা ১০ মিনিটের দিকে ধানমন্ডি মডেল থানাধীন ১২/এ নম্বর সড়কে ডিঙ্গি রেস্টুরেন্টের সামনে খোরশেদ আলম (৫০) নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে অস্ত্রের মুখে ৩৮ লাখ টাকা ছিনতাই করে সশস্ত্র ছিনতাইকারী দল। এ দুটি ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে আসায় দ্রুত অপরাধীদের পাকড়াও করেন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা।
গত ৯ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে ঢাকার ধামরাইয়ে নৈশপ্রহরীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ‘বিল্লাল অটো চার্জিং পয়েন্টে’ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাত দল চারটি ইজিবাইক ও ছয়টি ব্যাটারি নিয়ে যায়। এর দুদিন আগে রাত ১টার দিকে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার একতারপুর বাজারে চারজন নৈশপ্রহরীকে বেঁধে পাঁচটি দোকানে ঢুকে মালামাল লুট করে সশস্ত্র ডাকাত দল।
গত ১৯ মার্চ উত্তরা এলাকায় ছিনতাইকারীদের হামলায় মুক্তা আক্তার ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে সোহেলি ইসলাম নিহত হন। ২৯ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে স্কুলশিক্ষিক রনজিনা পারভীনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকেই টার্গেট ঠিক করে অদূরে ওত পেতে থাকে। ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা উত্তোলন, ব্যবসায়িক লেনদেন, রাতে জনশূন্য সড়ক, নিরাপত্তাকর্মী কম থাকা প্রতিষ্ঠান, অটোরিকশা ও ব্যাটারি রাখার স্থান অপরাধীদের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। কোনো কোনো ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। আবার কোথাও ধারালো অস্ত্র হাতে হামলে পড়ছে সংঘবদ্ধ দল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক আগামীর সময়কে বললেন, “অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারিতে আন্তঃথানা সমন্বয় বাড়াতে হবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু মামলা কমানোর হিসাবে নয়, অপরাধ প্রতিরোধে গুরুত্ব দিতে হবে। রাতের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার, ব্যাংক ও ব্যবসায়িক এলাকায় পুলিশের টহল বাড়াতে হবে। অপরাধপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করতে হবে। করতে হবে নিয়মিত ‘হটস্পট ম্যাপিং’। অন্ধকার ও জনশূন্য এলাকায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা উত্তোলনের পর নিরাপদ চলাচলে বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও ব্যবসায়িক এলাকায় কার্যকর সিসিটিভি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। শুধু ক্যামেরা বসালেই হবে না। ফুটেজ সংরক্ষণ এবং দ্রুত বিশ্লেষণের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।”
এক প্রশ্নের জবাবে এই অপরাধ বিশ্লেষক বললেন, ‘গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ অভিযান চালাতে হবে। একই সঙ্গে থানায় অভিযোগ গ্রহণ এবং বিচারিকপ্রক্রিয়া সহজীকরণের উদ্যোগ নিতে



