শাহবাগ থানায় ১৮ দিনে ২৪ অজ্ঞাত লাশ
- প্রতি মাসে ৩০-৪০টি অজ্ঞাতপরিচয়ের মরদেহ নথিভুক্ত হয়
- দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অজ্ঞাতনামা মরদেহ আসে ঢামেক হাসপাতালে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গত ১২ আগস্ট দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ট্রলিতে করে আনা হয় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে। সঙ্গে ছিলেন এক ব্যক্তি। নিজেকে কিশোরীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে তিনি কর্তব্যরত চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু ট্রলি এগিয়ে জরুরি বিভাগের দিকে যেতেই রহস্যজনকভাবে পালিয়ে যান। চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানালেন, কিশোরী আগেই মারা গেছে।
এরপর কেটে গেছে কয়েক দিন। পুলিশ খুঁজেছে তার পরিচয়, স্বজনের সন্ধান। আঙুলের ছাপ, বিভিন্ন তথ্য এবং সম্ভাব্য সব সূত্র ধরে চেষ্টা হয়েছে। শাহবাগ থানায় হয়েছে অপমৃত্যু মামলা। মরদেহের ছবি ও তথ্য দিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নিউজ পোর্টালেও প্রকাশ করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তি। তবু ১৮ আগস্ট পর্যন্ত পরিচয় মেলেনি সেই কিশোরীর।
সে একা নয়। রাজধানীর শাহবাগ এলাকা যেন দিন দিন পরিচয়হীন মানুষের শেষ যাত্রার এক নীরব ঠিকানায় পরিণত হচ্ছে।
১৭ আগস্ট জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সামনের ইউটার্নের ফুটপাত থেকে উদ্ধার করা হয় অজ্ঞাতপরিচয় প্রায় ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মরদেহ। এর আগে ২৯ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হলের বিপরীত পাশে ফুটওভার ব্রিজের নিচ থেকে উদ্ধার হয় আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী আরেক ব্যক্তির মরদেহ। তারও আগে ১২ জুলাই এক দিনেই শাহবাগের পৃথক তিনটি স্থান থেকে উদ্ধার করা হয় অজ্ঞাতনামা তিনজনের মরদেহ। পরে পুলিশ জানায়, তাদের অধিকাংশই ছিলেন ভবঘুরে প্রকৃতির।
তবে পুলিশের খাতায় অজ্ঞাতনামা হিসেবে নথিভুক্ত হওয়া এসব মরদেহের সংখ্যা শুধু শাহবাগ এলাকায় উদ্ধার হওয়া লাশেই সীমাবদ্ধ নয়। শাহবাগ থানার ওসি মনিরুজ্জামান আগামীর সময়কে বলেছেন, শাহবাগ এলাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, জাতীয় শহীদ মিনার, তিন নেতার মাজার ও গোলাপ শাহ মাজারসহ বিস্তীর্ণ খোলামেলা এলাকা রয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, ‘এই এলাকায় অজ্ঞাতনামা মরদেহগুলোর বেশিরভাগই ভবঘুরে প্রকৃতির। আবার শুধু শাহবাগ এলাকা থেকেই নয়, বিভিন্ন স্থান থেকে দুর্ঘটনায় নিহত বা অজ্ঞাতনামা মরদেহও ঢামেককেন্দ্রিক হওয়ায় শাহবাগ থানায় নথিভুক্ত হয়। এ কারণেই এ থানায় অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বেশি দেখা যায়।’ ঢামেক হাসপাতালের মর্গের দায়িত্বে থাকা লিটন ইসলাম জানালেন, চলতি আগস্টের ১ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত হাসপাতালে ২৪টি অজ্ঞাতনামা মরদেহ এসেছে। এর আগের মাস জুলাইয়ে আসে অর্ধশতাধিক অজ্ঞাতনামা মরদেহ। এর অধিকাংশই শাহবাগ থানাধীন এলাকা ও আশপাশ থেকে উদ্ধার করা।
ঢামেক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) ফারুক হোসেন বললেন, পরিচয়হীন রোগী ও মরদেহের চিকিৎসা এবং ব্যবস্থাপনায় পুলিশও সহযোগিতা করে। বেশিরভাগ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি রেল ও সড়ক দুর্ঘটনা, অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়া কিংবা বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালে আসেন। মৃত বা অর্ধমৃত অবস্থায় আনা কোনো অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি মারা গেলে তাকে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়।
হাসপাতালে অসুস্থ মানুষকে এনে ফেলে রেখে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও কম নয়। ফারুক হোসেন জানালেন, একবার নরসিংদীর পলাশ থেকে এক ব্যক্তি নিজের ছেলের মরদেহ হাসপাতালে রেখে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে পুলিশ তাকে শনাক্ত করে মরদেহ বুঝিয়ে দেয়।
ঢামেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, অধিকাংশ অজ্ঞাতনামা মরদেহ প্রথমে শাহবাগ থানার কাছে হস্তান্তর করা হয়। অন্য কোনো থানার এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া হলে সংশ্লিষ্ট থানাকে জানানো হয়। এরপর পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢামেক মর্গে পাঠায়। অনেক সময় দাফনের আগমুহূর্তে, এমনকি দাফনের পরও স্বজনরা এসে পরিচয় শনাক্ত করেন।
ঢামেক প্রশাসনিকভাবে শাহবাগ থানার আওতাভুক্ত হওয়ায় অজ্ঞাতনামা মরদেহ শনাক্তের পুরো প্রক্রিয়ার সমন্বয়ের দায়িত্বও মূলত এই থানার ওপর। মর্গকেন্দ্রিক দায়িত্ব পালনে শাহবাগ থানার দুজন উপপরিদর্শক ও দুজন কনস্টেবল ৮ ঘণ্টা করে দুই ধাপে কাজ করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাহবাগ থানার এক কর্মকর্তা জানালেন, পরিচয় শনাক্তে সিআইডি ও পিবিআই নিয়মিত ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ডিএনএ সংগ্রহ করে। কিন্তু সবক্ষেত্রে প্রযুক্তিও সমাধান দিতে পারে না। অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। কারও আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে যায়, আবার মরদেহ পচে যাওয়ায় বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হয় না। ফলে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ থাকলেও পরিচয় নিশ্চিত করা যায় না। শেষ পর্যন্ত পরিচয়হীনই থেকে যায় বহু মানুষ। পুলিশ জানিয়েছে, ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও পরিচয় না মিললে মরদেহের ছবি ও তথ্য দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এরপরও স্বজনের সন্ধান না পাওয়া গেলে নির্দিষ্ট সময় পর আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহায়তায় দাফন করা হয়।
তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অজ্ঞাতনামা মরদেহকে শুধু একটি সংখ্যা বা ‘বেওয়ারিশ লাশ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে দুর্ঘটনা, অবহেলা কিংবা আরও গুরুতর কোনো অপরাধের রহস্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আগামীর সময়কে বললেন, ঢামেকে অজ্ঞাতনামা রোগী ও মরদেহের জন্য পৃথক ইউনিট চালু করা জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো দুর্ঘটনায় কাউকে হাসপাতালে নিয়ে এলে বাহক কিংবা রোগীর পরিচয় নিশ্চিতের উদ্যোগ নিতে হবে। রোগীর শরীরের বিশেষ দাগ এবং মৃত্যুর কারণ সুরতহালে গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করতে হবে।
তার ভাষায়, ‘ভবঘুরে বলে বা অজ্ঞাতনামা বলে ফেলে রাখা যাবে না। প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচয় শনাক্তের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। অজ্ঞাতনামা মরদেহের পেছনে অপরাধের রাজ্যও লুকিয়ে থাকতে পারে। তাই পরিচয়হীন মানুষকে শুধু একটি সংখ্যা হিসেবে নয়, একজন নাগরিক হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তার মৃত্যুর কারণও খুঁজে বের করতে হবে।’






