দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা সামাদ

দৃষ্টিহীন শত শত শিক্ষার্থী শিক্ষক আবদুস সামাদের হাত ধরেই স্বপ্ন দেখতে শিখেছে
আলোহীন চোখে স্বপ্নের বুনন তার হাত ধরেই। শত শত শিক্ষার্থী অদেখা জগৎটাকে প্রথম তার চোখ দিয়েই দেখেছেন। ধীরে ধীরে অসাড় চোখ জোড়ায় দিয়েছেন আলো। দৃষ্টিশক্তির চেয়েও প্রখর সেই আলো। সমাজের পশ্চাৎপদতা, অবজ্ঞা-অবহেলার বিরুদ্ধে এ এক নিদারুণ শক্তি— শিক্ষার আলো। সত্যি, এই জনপদের দৃষ্টিহীন শত শত শিক্ষার্থী শিক্ষক আবদুস সামাদের হাত ধরেই স্বপ্ন দেখতে শিখেছে, ভালোবাসতে শিখেছে, শিখেছে মানবিকতা।
রবীন্দ্রনাথের ‘অন্ধজনে দেহ আলো’ কথাটা আবদুস সামাদের কর্মের সঙ্গে মিলে যায়। মো. আবদুস সামাদ শুধু দৃষ্টিহীনদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়াননি, তিনি পশ্চাৎপদ সমাজকেও বার্তা দিয়েছেন যে, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা করুণার পাত্র নন আর। তারাও সমাজে মাথা উঁচু করে চলতে পারে। দৃষ্টিহীনতা কোনো অপরাধ নয়।
আবদুস সামাদ নগরের মুরাদপুরের সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ১৯৮৯ সালে যোগ দিয়েছিলেন, প্রধান শিক্ষক হিসেবে ২০১৮ সালের মার্চে অবসরে যান। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনের এই স্কুলটিতে শুরুতে শুধু প্রাথমিক পর্যন্ত পাঠদান হতো। পরে সেখানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের ব্যবস্থাও হয় আবদুস সামাদের হাত ধরেই।
আবদুস সামাদ বলছিলেন, ‘প্রথমদিকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েকে পরিবার কিংবা সমাজ অপয়া মনে করত। তাদের পড়ালেখা শেখাতেও তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না অভিভাবকদের। পরে আমরা ঘরে ঘরে গিয়ে বাবা-মাকে বুঝিয়েছি তাদের লেখাপড়ার জন্য। স্কুলে এনে পড়িয়েছি। অনেক শিক্ষাসামগ্রীর সংকট ছিল। ব্রেইল বই ছিল না পর্যাপ্ত। তারপরও দুই শতাধিক ছেলেমেয়েকে এসএসসি পাস করিয়েছি।’ বিদ্যালয়টিতে একটি হোস্টেল রয়েছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের আলাদা করে ওই হোস্টেলে রাখা হতো। এই শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগের পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। ঠিকমতো শিক্ষা উপকরণ কিনতে পারত না। সমাজসেবা থেকে হোস্টেলে থাকা-খাওয়ার খরচের কিছুটা দেওয়া হলেও অন্যান্য খরচের জন্য ছেলেমেয়েরা তাকিয়ে থাকত আবদুস সামাদের দিকে। তিনি নিজের বেতন এবং বিভিন্ন অনুরাগী লোকজনের কাছ থেকে সাহায্য এনে চালাতেন তাদের পড়ার খরচ। এই শিক্ষার্থীদের দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়, এ রকম কোনো একটি স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিতে হয়। বিশেষ করে, রহমানিয়া স্কুল থেকে প্রতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা।
একপর্যায়ে সাত-আট বছর আগে হোস্টেলটি বন্ধ হয়ে যায়। তখন বিপাকে পড়ে যায় অনেক শিক্ষার্থী। আবদুস সামাদ তখন অবসরে চলে যান। অবসরে গিয়েও তিনি বসে থাকেননি। বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা ছেলেমেয়েদের থাকার জায়গা নেই। হোস্টেল বন্ধ। আবদুস সামাদ নগরের হামজারবাগ এলাকায় দুটি ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিলেন। একটিতে ছেলেরা এবং অন্যটিতে মেয়েরা থেকে লেখাপড়া শুরু করল। আবদুস সামাদ সবসময় তাদের তত্ত্বাবধান করে যান। থাকা-খাওয়া বাবদ খুব সামান্যই ছেলেমেয়েরা দিতে পারে। বাকিটা তাদের শিক্ষক সামাদ স্যার ব্যবস্থা করবেন— এমন একটা রীতি চালু হয়ে যায়।
সামাদের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শাহজাহান এখন ইপিজেডে একটা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। এই কর্মকর্তা বলেছেন, বর্তমানে হোস্টেল দুটিতে প্রায় ২০ জনের মতো শিক্ষার্থী রয়েছে। সবাই টাকা দিতে পারে না। কিছু কিছু দেয়। বাকিটা সামাদ স্যার নিজের পেনশনের টাকা এবং অনুরাগীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে খরচ করেন। কিন্তু এক বছর ধরে স্যার অসুস্থ। এখন তাই একটু সমস্যা হয়ে গেছে।
আবদুস সামাদ বছর খানেক ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছেন। দুটি কিডনিই ক্ষতিগ্রস্ত। তার এখন ডায়ালাইসিস চলছে। তার চিকিৎসা খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে পরিবারও। চট্টগ্রাম শহরে ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এখন অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। তারপরও দৃষ্টিহীন ছেলেমেয়েদের কথা এক মুহূর্তের জন্য ভোলেননি তিনি। পরীক্ষায় তাদের শ্রুত লেখক জোগাড় করে দেওয়া, খাওয়া-দাওয়া— সব নিয়েই তার চিন্তা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত প্রাক্তন ছাত্র আল আমীন বললেন, ‘সামাদ স্যার অনেক জায়গায় অনুরোধ করে আমাদের চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। প্রতিবন্ধী বলে অনেকে চাকরি দিতে চায় না। এখনো তিনি আমাদের নিয়ে ভাবেন। অথচ তিনিই আজ শয্যাশায়ী।’






