স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে নিঃস্ব কোটি মানুষ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে প্রতি মাসে ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবারকে অসুস্থতার জন্য নিজের পকেট থেকে টাকা খরচ করতে হচ্ছে। ২০০৫ সালে এই খরচ করতে হতো ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারকে। স্বাস্থ্যসেবার খরচ মেটাতে গিয়ে দেশের ৬ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।
‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট ও স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা বণ্টন মূল্যায়ন’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে এই গবেষণার ফলাফল অবহিতকরণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
এই প্রতিবেদনে ২০০৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত জাতীয় খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ ও সুইডিস দূতাবাসের আর্থিক সহায়তায় গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট।
গবেষণার তথ্য বলছে, দেশে দরিদ্রতা কমছে। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে মানুষের আর্থিক সংকট বাড়ছে। প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে চারজনকে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়। গ্রামের ৪৭ শতাংশ মানুষকে এই সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ধনীদের মধ্যে এই হার ২৮ শতাংশ। আর সবচেয়ে বেশি আর্থিক দুর্ভোগে পড়ে বরিশাল বিভাগের মানুষ, ৪১ শতাংশ। অথচ ২০০৫ সালে এই বিভাগে সংকটের হার সবচেয়ে কম ছিল।
গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনকালে বরিশাল বিভাগের এই সংকট বৃদ্ধির কারণ হিসেবে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের ফোকাল পয়েন্ট সুব্রত পাল বলছেন, ‘সময়ের সঙ্গে বরিশালে স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্তির সুযোগ না বাড়ায় এবং বরিশাল থেকে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসা নিতে যাতায়াত খরচ এক্ষেত্রে একটা বড় বিষয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, স্বাস্থ্য ব্যয়ের বোঝা কমাতে দেশের সব জায়গায় সমান গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য করতে হবে।’
স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বেশি খরচ ওষুধের পেছনে হয় বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর পরের খরচ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে। এই খরচ বহন করতে গিয়ে কোনো কোনো পরিবারের দৈনন্দিন খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যের পেছনে ২০২২ সালে গড়ে প্রতি মাসে প্রতিটি পরিবারকে ৩ হাজারের বেশি টাকা খরচ করতে হয়েছে। এই খরচ ২০০৫ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। ধনীদের তুলনায় গরিব মানুষের মধ্যে এই দুর্ভোগের মাত্রা বেশি।
গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, একই সময়ে ফার্মেসিতে সেবা নেওয়া মানুষের হারও বেড়েছে। ২০০৫ সালে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ ফার্মেসিতে সেবা নিতেন। এই হার বেড়ে ২০২২ সালে দাঁড়িয়েছে ৫৫ শতাংশের বেশি। একই সময়ে প্রাইভেট হাসপাতালে সেবা নেওয়া মানুষের হারও বেড়েছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের পরিচালক এস এম আবু হোরায়রা বলছেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে সাধারণ মানুষকে পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। অসুস্থতার সময় চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। কোনো কোনো পরিবারে দরিদ্রতা নেমে আসে।’
অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলছেন, ‘স্বাস্থ্যসেবার খরচের এই ফলাফলের দায় বা কৃতিত্ব কোনোটাই আমাদের নয়। এই দায় ফ্যাসিস্ট সরকারের। এই চিত্র বলে দিচ্ছে ২০০৫ সালে বিএনপি স্বাস্থ্য খাতকে কেমন অবস্থায় রেখে গিয়েছিল, আর ১৭ বছরে ফ্যাসিস্ট সরকার কী বেহাল দশা করেছে।’ তবে এই ফলাফলকে ভিত্তি ধরে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ও মানুষের পকেট থেকে স্বাস্থ্য ব্যয় কমাতে বর্তমান সরকার কাজ করছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা ৩.৮.২-এর সূচক পরিমাপের ওপর তথ্য উপস্থাপন করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশের এনপিও মো. তৌহিদুল ইসলাম, গবেষণার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশের জাতীয় পরামর্শক সায়েম আহমেদ।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক মো. এনামুল হকের সভাপতিত্বে এতে আরও বক্তব্য দেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রাজেশ নারওয়াল প্রমুখ।



