জাপান কেন মনে রেখেছে কুষ্টিয়ার বিচারপতি রাধাবিনোদ পালকে
- টোকিও ও কিয়োটোয় আছে বিনোদের স্মৃতিস্তম্ভ

রাধাবিনোদ পাল
বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের বন্ধুত্বের ইতিহাসে উন্নয়ন সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি জড়িয়ে আছে এক বাঙালি বিচারপতির নাম। তিনি রাধাবিনোদ পাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের নেতাদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনালে তার দেওয়া ভিন্নমতপূর্ণ রায় তাকে জাপানের ইতিহাসে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে। বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় জন্ম নেওয়া এই বিচারপতির স্মরণে জাপানের রাজধানী টোকিওর ইয়াসুকুনি মন্দিরে রয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। কিয়োটোতেও তার স্মরণে স্মৃতিফলকের উল্লেখ পাওয়া যায়।
টোকিও ট্রায়ালে যে রায় তাকে স্মরণীয় করেছে
১৮৮৬ সালের ২৭ জানুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রদেশের কুষ্টিয়া অঞ্চলের সালিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রাধাবিনোদ পাল। তার জন্মস্থান বর্তমানে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। রাজশাহী কলেজে পড়াশোনার পর কলকাতায় গণিত ও আইন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে ১৯৪৬ সালে গঠিত হয় আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফার ইস্ট। এটি সাধারণভাবে টোকিও ট্রায়াল নামে পরিচিত। এগারোটি দেশের ১১জন বিচারক এই ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালন করেন। ভারতীয় বিচারক হিসেবে সেখানে ছিলেন রাধাবিনোদ পাল।
১৯৪৮ সালে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক অভিযুক্ত জাপানি নেতাদের দোষী সাব্যস্ত করেন। কিন্তু রাধাবিনোদ পাল ভিন্নমত প্রকাশ করেন। তার যুক্তি ছিল, বিচারের আইনি ভিত্তি এবং বিজয়ী শক্তির হাতে পরাজিতদের বিচারের পদ্ধতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। তিনি অভিযুক্তদের সবাইকে খালাস দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
তার প্রায় ১ হাজার ২৩৫ পৃষ্ঠার ভিন্নমতপূর্ণ রায়ে আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ, অতীতের ঘটনাকে পরবর্তী সময়ে তৈরি আইনের ভিত্তিতে অপরাধ হিসেবে বিচার করা এবং বিজয়ী শক্তির বিচারিক নিরপেক্ষতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ছিল। তার মূল বক্তব্য ছিল ট্রাইব্যুনালের আইনি ভিত্তি ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে।
টোকিওর যেখানে রয়েছে তার স্মৃতিস্তম্ভ
জাপানে রাধাবিনোদ পালের স্মরণে সবচেয়ে সুপরিচিত স্মৃতিস্তম্ভটি রয়েছে টোকিওর চিয়োদা এলাকায় অবস্থিত ইয়াসুকুনি মন্দিরের প্রাঙ্গণে।
জাপানের সরকারি যুদ্ধস্মৃতি-সংক্রান্ত বিতর্কে বহুল আলোচিত এ মন্দিরের প্রাঙ্গণে ২০০৫ সালে রাধাবিনোদ পালের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়। মন্দিরের নিজস্ব দর্শনার্থী নির্দেশিকায় স্মৃতিস্তম্ভটির উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৯৪৬ সালের আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনালে পালের ভূমিকা এবং তার বিচারিক অবস্থানকে সম্মান জানাতে এটি নির্মাণ করা হয়। কিয়োটো শহরেও রাধাবিনোদ পালের স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।
জাপান-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের এক ঐতিহাসিক সূত্র
জাপান ও বাংলাদেশের সম্পর্কের পেছনে রাধাবিনোদ পালের ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক যোগসূত্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাপান দ্রুত দেশটিকে স্বীকৃতি দেয় এবং সময়ের সঙ্গে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা গভীর হয়। অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবহন, বিদ্যুৎ, বন্দর, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানের ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও বিনিয়োগের সম্ভাবনাও বাড়ছে। অন্যদিকে, রাধাবিনোদ পালের স্মৃতি দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে একটি মানবিক ও ঐতিহাসিক মাত্রা যোগ করে আছে।



