সব মহানগরে আসছে মেট্রোরেল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের প্রচলিত গণপরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে ব্যবহারকারীদের অসন্তোষের যেন শেষ নেই। লক্কড়ঝক্কড় বাস, চালকদের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করা, জবাবদিহির অভাব, মেট্রোরেলে চিড়েচ্যাপ্টা হওয়া, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মেট্রোর রুট না থাকাসহ নানা সমস্যার কথা রোজ পথে কান পাতলেই শোনা যায়। গণপরিবহনের এ ব্যবস্থা তাই বদলে দিতে চায় সরকার। শুধু ঢাকার জন্য নয়, অন্যান্য মহানগর এলাকার জন্যও নেওয়া হচ্ছে মেট্রোরেল, এলিভেটেড রেল, সার্কুলার কমিউটার লাইন এবং মনোরেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা। দেশে এখন মহানগরের সংখ্যা ১২টি। এর সঙ্গে বগুড়া সিটি করপোরেশন যুক্ত হলে ১৩টি মহানগরের গণপরিবহনে লাগবে আধুনিকতার ছোঁয়া।
এ ছাড়া ঢাকা ও প্রধান আঞ্চলিক শহরগুলোর মধ্যে দ্রুতগতির বুলেট ট্রেন সংযোগের জন্য পরিকল্পনাও করা হবে। পাশাপাশি সব জেলা ও প্রধান শহরগুলোকে সংযুক্ত করে গড়ে তোলা হবে একটি সমন্বিত জাতীয় রেল নেটওয়ার্ক। সেই সঙ্গে সম্প্রসারিত বিমানবন্দর ও বিমানঘাঁটির মাধ্যমে বিভাগীয়, রাজধানী ও জেলা শহরগুলোকে সংযুক্ত করে গড়ে উঠবে একটি জাতীয় বিমান সংযোগ ব্যবস্থা।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) তৈরি করা ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে উল্লেখ করা হয়েছে এসব কথা। চলতি অর্থবছর থেকে শুরু হয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যও ঠিক করা হয়েছে।
পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার আগামীর সময়কে বললেন, ‘পঞ্চবার্ষিক এ পরিকল্পনাটি শুধু কাগজ-কলমে লিপিবদ্ধ একটি ডকুমেন্ট নয়। এটি যাতে বাস্তবায়ন পর্যায়ে যায় সেজন্য মনিটরিং ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হবে। বছরে দুবার এ কমিটির বৈঠক হবে। সেখানে যে মন্ত্রণালয়কে যেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেগুলোর অগ্রগতি জানতে চাওয়া হবে। যদি অগ্রগতি ভালো না হয় তাহলে তাদের জবাবদিহির আওতায় নেওয়া হবে।’
ফ্রেমওয়ার্কে বলা হয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-পঞ্চগড় ও ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ প্রধান রেল করিডরগুলোতে বিদ্যুতায়ন ও ডাবল-ট্র্যাক নির্মাণ করা হবে। মিয়ানমারভিত্তিক রুট এবং ঢাকা-কুনমিং রেল সংযোগসহ আঞ্চলিকসহ রেল সংযোগ অগ্রাধিকার পাবে। নিরাপত্তা ও পরিচালনগত দক্ষতার জন্য আরও এক্সপ্রেস আন্তঃনগর রেল পরিষেবা চালু করা এবং স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেম বাস্তবায়ন করা হবে। প্রবর্তন হবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি, শিক্ষার্থী, প্রবীণ নাগরিক এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিনামূল্যে ভ্রমণ ও ছাড়যুক্ত ভাড়াব্যবস্থা। দেশের সব অর্থনৈতিক অঞ্চল, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডর, শিল্পাঞ্চল, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর এবং আইসিডিএসের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হবে রেল সংযোগ। নির্ধারিত মালবাহী ট্রেন পরিষেবা, আধুনিক সংকেত ব্যবস্থা, রোলিং স্টক রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, জরুরি উদ্ধার অভিযানের উন্নত ব্যবস্থা থাকবে। যাত্রী, পণ্যবাহী এবং নগর রেলব্যবস্থা পিপিপিভিত্তিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করা হবে। সব রেলস্টেশনে বিনামূল্যে থাকবে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ। লোকোমোটিভ ও যাত্রীবাহী কোচের সংখ্যা বাড়িয়ে রেলপথের কার্যকর ব্যবহারের জন্য যাত্রীবাহী ট্রেনের চলাচল বাড়ানো হবে।
বিমান যোগাযোগের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান বিমান চলাচল কেন্দ্রে রূপান্তরিত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ রূপান্তরটি একটি জাতীয় বিমান সংযোগ গ্রিড তৈরির ওপর কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে, যা বিমানবন্দর ও বিমানঘাঁটির একটি সম্প্রসারিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভাগীয় রাজধানী ও জেলা শহরগুলোকে সংযুক্ত করবে এবং এটি দেশকে একটি কৌশলগত আঞ্চলিক প্রবেশদ্বার হিসেবে নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি কক্সবাজার, যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুরে নতুন আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলা হবে। বিমানবন্দরে যাত্রীদের অধিকার নিশ্চিত করা, টিকিটের কালোবাজার ও জালিয়াতি প্রতিরোধ করা এবং প্রবাসী যাত্রীদের হয়রানি কমানো হবে।
ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেনের ভাষ্য, ‘ফ্রেমওয়ার্কের সামগ্রিক লক্ষ্য হলো সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও টেকসই পরিবহন মাধ্যমগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা। সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী চলাচল নিশ্চিত করতে আন্তঃআঞ্চলিক সংযোগ জোরদার করা। এক্ষেত্রে উপকূলীয় অঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরকে কৌশলগত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক গতিশীলতার জন্য প্রধান সেতু, ফ্লাইওভার ও পাতাল পথ নির্মাণ করা হবে। প্রধান বন্দর ও বিমানবন্দরগুলোকে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করা হবে। সমুদ্র, সড়ক, রেল ও জলপথ নেটওয়ার্ককে সমন্বিত করে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে সমন্বিত লজিস্টিকস হাব স্থাপন করা হবে।’
জিইডির তথ্য বলছে, দেশে চলাচলের প্রায় ৮৮ শতাংশ সম্পন্ন করত সড়ক পথের বাস। এর বিপরীতে, যাত্রী পরিবহনে রেলওয়ের অবদান ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। একক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অভাবে সড়ক উন্নয়নের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, ফলে পণ্য পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে ১৯৭৫ সালের ৩৫ থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ৭৭ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে, একই সময়ে রেল এবং অভ্যন্তরীণ জলপথ পরিবহনের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যথাক্রমে ২৮ থেকে ১৬ এবং ৩৭ থেকে ৭ শতাংশ হয়েছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য, একটি ভারসাম্যপূর্ণ বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থার প্রয়োজন, যা সমুদ্রের সঙ্গে সংযুক্ত নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতির বিপুল সম্ভাবনা এবং রেলওয়ে আন্তঃমাধ্যম কনটেইনার পরিষেবার সুযোগকে কাজে লাগাতে পারবে।






