সিরিয়াকে ‘সন্ত্রাসবাদে মদদদাতা রাষ্ট্রের’ তালিকা থেকে বাদ দিল যুক্তরাষ্ট্র

তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে সিরিয়ান প্রেসিডেন্ট আল-শারার সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
সিরিয়াকে ‘সন্ত্রাসবাদে মদদদাতা রাষ্ট্রের’ তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা এই সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধের পর দেশ পুনর্গঠনে এই সিদ্ধান্ত সহায়তা করবে।
স্থানীয় সময় সোমবার থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। এর আগে ৪৫ দিন মার্কিন কংগ্রেসে এ বিষয়ে পর্যালোচনা হয়েছে।
গত ৮ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন, তিনি কয়েক দশকের পুরনো এ তালিকা থেকে সিরিয়ার নাম বাদ দিতে চান।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেছেন, সিরিয়াকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে দেশটির প্রেসিডেন্ট আল-শারার ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং আরও কিছু প্রতিশ্রুতির’ স্বীকৃতি হিসেবে। এর মাধ্যমে সিরিয়াকে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ থেকে পুরোপুরি দূরে রাখার’ প্রতিশ্রুতিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
আল-শারা এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছেন।
তিনি ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, সিরিয়া তার ‘বেদনাদায়ক অতীতের একটি পৃষ্ঠা ছিঁড়ে’ উন্নয়ন, পুনর্গঠন ও দেশ গড়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
১৯৭৯ সাল থেকে সিরিয়া এই তালিকায় ছিল। ওই সময় ওয়াশিংটন সাবেক প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদের সরকারকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের জন্য অভিযুক্ত করে।
তার ছেলে বাশার আল-আসাদের শাসনামলেও সিরিয়া তালিকায় ছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আল-শারার নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহীরা বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে।
এ তালিকায় থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তা, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি ও বিক্রি, কিছু বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাজে ব্যবহারযোগ্য পণ্য এবং আর্থিক লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা থাকে। সিরিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরও এই তালিকায় থাকা দেশটির ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় বাধা হয়ে ছিল।
সোমবারের ঘোষণায় আল-শারার নেতৃত্বাধীন আল-নুসরা ফ্রন্টকেও আন্তর্জাতিক ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটি হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) নামেও পরিচিত। একসময় এটি আল-কায়েদার সিরিয়া শাখা ছিল।
এ সিদ্ধান্তকে আল-শারার প্রতি ওয়াশিংটনের আরও একটি আস্থার প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তিনি সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে ট্রাম্প ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর সঙ্গে বৈঠকও করেছেন আল-শারা।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আজকের এই সিদ্ধান্ত সিরিয়ায় আরও বিনিয়োগের পথ তৈরি করবে। এর ফলে দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়বে।’ তিনি বলেছেন, এই পদক্ষেপ সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার জন্য ট্রাম্পের দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত ‘সিরিয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এবং নতুন অধ্যায়ের সূচনা’।
মন্ত্রণালয়টি আরও বলেছে, এই পদক্ষেপ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় সহায়তা করবে। একই সঙ্গে পুনর্গঠন, স্থিতিশীলতা এবং সিরিয়া ও পুরো অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করবে।
সিরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর সাফওয়াত রাসলান এক্সে বলেছেন, এটি ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’। এর মাধ্যমে সিরিয়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তার ‘স্বাভাবিক অবস্থানে’ ফিরতে পারবে।
তিনি বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে।
সিরিয়ার অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ বারনিয়েহ যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে ‘সিরিয়ার কূটনীতির বড় ও ঐতিহাসিক সাফল্য’ বলে অভিহিত করেছেন বলে দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা সানা জানিয়েছে।
তিনি বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত সিরিয়াকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার পথ খুলে দেবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি আনা এবং উন্নয়নের সুযোগ তৈরির পথও সহজ হবে।
সিরিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন দূত টম বারাকও সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, এই তালিকা থেকে সিরিয়াকে বাদ দেওয়া দেশটির ‘বিচ্ছিন্নতা থেকে অংশীদারত্বে এবং সন্ত্রাসবাদের উৎস থেকে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতিশীল অংশীদারে পরিণত হওয়ার অসাধারণ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’।
সূত্র : আলজাজিরা







