নজরুলের দর্শন ভূরাজনৈতিক অবক্ষয়ের মহৌষধ

উইনস্টন ল্যাংলি
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও রাজনৈতিক দর্শনকে আধুনিক ভূরাজনৈতিক খণ্ডনের মহৌষধ হিসেবে অভিহিত করলেন মার্কিন রাজনীতিবিজ্ঞানী এবং ইমেরিটাস অধ্যাপক উইনস্টন ই. ল্যাংলি। তার মতে, নজরুলের দর্শন কাঠামোগত নৈতিক অবক্ষয় নিরাময়েরও চূড়ান্ত রূপরেখা দেয়। তিন দশকের গভীর গবেষণার ওপর ভিত্তি করে নজরুলের এই বৈশ্বিক উপযোগিতা তুলে ধরেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভোস্ট এবং অ্যাকাডেমিক অ্যাফেয়ার্সের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ল্যাংলি জাতীয় কবির সাহিত্যিক মূল্যায়নকে দেখেছেন আন্তর্জাতিক আইন ও সামষ্টিক নীতিশাস্ত্রের আলোকে।
বার্তা সংস্থা বাসসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ল্যাংলি তার মূল গ্রন্থ ‘কাজী নজরুল ইসলাম: দ্য ভয়েস অব পোয়েট্রি অ্যান্ড দ্য স্ট্রাগল ফর হিউম্যান হোলনেস’-এর মূল তত্ত্বের সম্প্রসারণ ঘটিয়ে বললেন, ‘বর্তমান আন্তর্জাতিক শাসনকাঠামো ব্যর্থ হচ্ছে, কারণ এটি একটি খণ্ড-বিখণ্ড বিশ্বকে খণ্ডিত হাতিয়ার দিয়ে মেরামত করার চেষ্টা করছে।’
তিনি দেখিয়েছেন, ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা চূড়ান্ত হওয়ার কয়েক দশক আগেই নজরুল চিহ্নিত করেছিলেন— মানুষকে জাতি, ভাষা, শ্রেণি বা ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করা মানবাত্মার বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত অপরাধ।
ল্যাংলির যুক্তি, আধুনিক পশ্চিমা উদারনৈতিক ব্যবস্থা যখন নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে ব্যক্তি-স্বাধীনতার ওপর জোর দেয়, তখন নজরুলের দর্শন দাবি করে এক বৈশ্বিক ‘পূর্ণাঙ্গতা’ বা ‘হিউম্যান হোলনেস’।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ হিসেবে এই মার্কিন গবেষক স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের বিভাজনমূলক ‘ক্লাস অব সিভিলাইজেশনস’ তত্ত্বকে জোরালোভাবে খণ্ডন করতে নজরুলের বহুত্ববাদী দর্শনকে ব্যবহার করেছেন। ল্যাংলি জোর দিয়ে বললেন, ‘নজরুলের মধ্যে ইসলামি আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, হিন্দু ভক্তিভাব এবং সমতাবাদী সমাজতান্ত্রিক চেতনার যে স্বতঃস্ফূর্ত ও জৈবিক সমন্বয় ঘটেছে, তা প্রমাণ করে যে সভ্যতার দেয়ালগুলো সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে তৈরি।’
তার সাম্প্রতিকতম গবেষণা গ্রন্থ ‘কাজী নজরুল ইসলাম: মোরাল কারেজ অ্যান্ড ট্রুথফুলনেস’-এ ল্যাংলি নজরুলকে জার্মানির প্রখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ ডিয়েট্রিচ বনিফার এবং আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ড. মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের মতো বিরল বিশ্বনেতাদের কাতারে স্থান দিয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান যুগে যখন পাবলিক লাইফ প্রাতিষ্ঠানিক বশ্যতা ও রাজনৈতিক আত্মসমর্পণের কারণে ব্যাপকভাবে কলুষিত, তখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নজরুলের ঐতিহাসিক ৪০ দিনের জেল-অনশনের মতো বাস্তব ত্যাগগুলো জনসমক্ষে সত্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় মোরাল কারেজ বা নৈতিক সাহসের এক চূড়ান্ত ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত।



