জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো যেত ধাপে ধাপে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বৈশ্বিক কারণে জ্বালানি আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে বাধ্য হয়ে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং সীমান্তপথে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি কমানোর কথাও বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি খাতে চরম অস্থিরতার কারণে দাম না বাড়ানো বিকল্প ছিল না সরকারের হাতে। তবে তারা বলছে, কিছু উদ্যোগ নিলে দাম আরও কম বাড়ালেও চলত। অথবা এক দফায় না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে বাড়ানোর সুযোগ ছিল। এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে ভবিষ্যতের টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
অনেক বিকল্প থাকলেও সরকার ও জ্বালানি বিভাগ তা দেখে না বলে মন্তব্য করেছেন ভোক্তা-অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, বিশ্ববাজারে অন্য পণ্যের দাম বাড়লে তখন ভ্যাট ও রাজস্ব আয় কমানো হলেও জ্বালানির মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের ক্ষেত্রে তা হয় না। আইন অনুযায়ী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির এখতিয়ার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের। যেখানে গণশুনানির মাধ্যমে ন্যায্যতার ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ হওয়ার কথা। কিন্তু সরকার তা না করে মধ্যরাতে ইচ্ছামতো তেলের মূল্যবৃদ্ধি করে। ফলে এখানে ভোক্তার অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে।
বিপিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ঘুষ, অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তিনি বললেন, বিপিসির আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা নেই। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার মানসম্মত নিরীক্ষার প্রস্তাব দিলেও তা করা হয়নি। একদিকে লোকসান দেখায়, অন্যদিকে কর্মীরা লাখ লাখ টাকা বোনাস নেয়। এগুলো বন্ধ হলে সরকারের ভর্তুকির চাপ এত বাড়ত না।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষক জাহাঙ্গীর আলম খান আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সবক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশ্ববাজাের জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দামের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির চাপ সরকারের ওপর পড়েছে। ফলে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এ মুহূর্তে বেতন বৃদ্ধি না করলে এই চাপ এড়ানো যেত।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয় মেটাতে চলতি বছর ব্যাংক থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলেছে সংস্থাটি। বর্তমানে ব্যাংক হিসাবে রয়েছে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। অথচ দুই মাসের আমদানি ব্যয়ের জন্য প্রয়োজন প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।
বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে ডিজেলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। এতে দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। শুধু ডিজেলেই বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানো হলে বছরে বিপিসির লোকসান ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
বিশ্বের সব দেশই জ্বালানির উচ্চ ব্যয়ে ভুগছে উল্লেখ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম তামিম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের পাশাপাশি এলএনজিতেও বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এত ভর্তুকি দেওয়া সরকারের পক্ষে অসম্ভব। ফলে দাম না বাড়িয়ে কোনো উপায় নেই। এতে অর্থনীতিতে প্রচণ্ড চাপ বাড়বে। মানুষের কষ্ট বেড়ে যাবে। তেলের ব্যবহার কমবে। তবে জ্বালানি তেল আমদানিতে সরকার যে ভ্যাট-ট্যাক্স নেয়, সেটা কমালে দাম এতটা বাড়ানো লাগত না বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।
এখন ডিজেল আমদানিতে মোট করভার প্রায় ৩৪ শতাংশ। চলতি বছরের এপ্রিলেই এমন একটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, যাতে মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ কিছুটা সীমিত থাকে।
২০২২ সালে আন্তর্জাতিক তেলের দাম বেড়ে গেলে ভারত পেট্রল ও ডিজেলের ওপর কেন্দ্রীয় আবগারি শুল্ক কমিয়েছিল। গত মার্চেও আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র অস্থিরতার সময় ভারত পেট্রল ও ডিজেল— উভয়ের ওপর লিটারপ্রতি ১০ রুপি করে আবগারি শুল্ক কমিয়েছে।
সব ধরনের জ্বালানিতে সমানভাবে ভর্তুকি না দিয়ে প্রয়োজনভিত্তিক ভর্তুকি দেওয়ার সুযোগ ছিল। ডিজেল ও কেরোসিনের ব্যবহার বেশি হওয়ায় এই দুই ধরনের জ্বালানিতে ভর্তুকি বাড়িয়ে দাম কিছুটা সহনশীল পর্যায়ে রাখা যেত।
জ্বালানি ভর্তুকিকে সরাসরি দরিদ্র মানুষের সহায়তায় রূপান্তর করারও সুযোগ ছিল। ইন্দোনেশিয়া ২০২২ সালে জ্বালানি সহায়তার একটি অংশ সরাসরি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের কাছে স্থানান্তর করেছিল।
এ ছাড়া একবারে ২০ টাকা না বাড়িয়ে কয়েক মাসে ছোট ছোট ধাপে সমন্বয় করলে বাজারে ধাক্কা কম লাগত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে প্রতিবেশী দেশে চোরাচালানের ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে সীমান্তভিত্তিক মূল্য ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা যেত।
এ ছাড়া সরকারি দপ্তরে জ্বালানি ব্যবহার সীমিত করা, সাশ্রয়ী হওয়া, বিপিসির ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় কমানো, সরবরাহ ব্যবস্থায় অপচয়, অনিয়ম, দুর্নীতি ও মধ্যস্বত্বের সুযোগ বন্ধ করাসহ কিছু উপায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা বাড়তে থাকায় সরকারের হাতে দাম না বাড়িয়ে বিকল্প নেই। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে তেলের ব্যবহার কমাতে বৈদ্যুতিক যানবাহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বিপিসির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, টানা ছয় বছর লোকসানের পর ২০১৪-১৫ সালে ৪ হাজার ২১২ কোটি টাকা মুনাফা করে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা লাভ করে বিপিসি। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মুনাফা করে ৬ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। ভ্যাট, ট্যাক্স, লভ্যাংশ, উদ্বৃত্ত মিলিয়ে সরকারি তহবিলে বিপুল টাকা জমা দিয়েছে বিপিসি।
এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা জমা রেখে সুদের মুনাফা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বোনাস হিসেবে ভাগ করে নিয়েছেন। তিন বিতরণ কোম্পানি— পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার কর্মীরা বছরে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত লাভের বোনাস নেওয়ার রেকর্ড রয়েছে। এ ছাড়া শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বহুতল ভবন বানানো হচ্ছে। এসব অযাচিত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা গেলেই অস্থিতিশীল সময়ে দাম না বাড়িয়েও বা সহনীয় পর্যায়ে বৃদ্ধি করে প্রতিষ্ঠান চলতে পারত বলে মনে করেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির যে স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলা রয়েছে, তা নিয়েও আপত্তি বিশেষজ্ঞদের। তাদের ভাষ্য, ভ্যাট-ট্যাক্স ও লাভ ধরে এই সূত্র ঠিক করা হয়েছে। ফলে যে দামই ধরা হোক না কেন, তাতে বিপিসির লাভ থাকেই।
এদিকে গতকাল সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির চরম দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশে তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না। দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের যে কষ্ট হবে, সেজন্য তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িক। সংকট কেটে গেলে তেলের দাম আবার কমানো হবে।
অতীতের তুলনায় বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা এবং বিপিসির তহবিল-সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই নজিরবিহীন সংকটে বিপিসির তহবিলে সংরক্ষিত অর্থ ছিল বলেই এতদিন মূল্য না বাড়িয়ে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল লোকসান সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে।



