গান-কবিতা-ক্যানভাসে একাত্তরের শরণার্থী ট্র্যাজেডি

আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়েছে স্মারক অনুষ্ঠান ‘৭১-এর শরণার্থী জীবন’ ও ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’।
গান, কবিতা, প্রামাণ্যচিত্র, প্রত্যক্ষ স্মৃতিচারণ ও চিত্রকলায় উঠে এসেছে একাত্তরের শরণার্থী জীবনের ভয়াবহতা। শনিবার আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে ‘স্মৃতি ৭১’-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে স্মারক অনুষ্ঠান ‘৭১-এর শরণার্থী জীবন’ ও ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। অনুষ্ঠানে ১৯৭১ সালের শরণার্থী সংকটের মানবিক অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হয়।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী সংকট প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা থেকে মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ লিখেছিলেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি। পরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও শরণার্থী সংকটের আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক স্মৃতির অন্যতম পরিচিত দলিল হয়ে ওঠে কবিতাটি। অনুষ্ঠানে কবিতাটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও একাত্তরের শরণার্থী জীবনের নানা দিক তুলে ধরা হয়।
জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জিন্নাত আরা হক। আয়োজকেরা বলেন, ইতিহাসের কাছে ফিরে গিয়ে একাত্তরের শরণার্থীদের জীবন, কণ্ঠ ও স্মৃতি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
অনুষ্ঠানে ফারুক এইচ খান একাত্তরের শরণার্থী সংকট এবং অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ‘ঘরবাড়ি ও স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে সীমান্ত পেরোনো মানুষের মানবিক বিপর্যয় কীভাবে গিন্সবার্গের কবিতায় বিশ্বজনীন ভাষা পেয়েছিল।’
১৫২ লাইনের কবিতাটি থেকে নির্বাচিত অংশ আবৃত্তি করেন মুস্তাক আহমেদ ও নাজনিন পাপ্পু। তাদের আবৃত্তিতে উঠে আসে শরণার্থীদের ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা, মৃত্যু, বিচ্ছেদ ও আশ্রয়ের আকুতি। কবিতাটিকে কেন্দ্র করে মৌসুমি ভৌমিকের গাওয়া বহুল পরিচিত গান পরিবেশন করেন নবনিতা হাবিব চৌধুরি। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘একাত্তরের শরণার্থী’ প্রদর্শন করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন প্রশিক্ষণকেন্দ্রে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল জুগিয়েছিলেন শিল্পীরা। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে অনুষ্ঠানে মঞ্চে নিয়ে আসেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব জামান। পরে তরুণ প্রজন্মের কয়েকজন তাদের উত্তরীয় পরিয়ে সম্মান জানান।
আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় একাত্তরের শরণার্থী মিছিলে নিজের মাকে হারানোর ব্যক্তিগত স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, যুদ্ধের বৃহৎ ইতিহাসের আড়ালে একটি পরিবারের বিচ্ছেদ আর একজন সন্তানের শোক চাপা পড়ে থাকে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, একাত্তরের শরণার্থী অভিজ্ঞতাকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দলিল হিসেবে দেখা প্রয়োজন। দেশ ছাড়ার সেই অভিজ্ঞতা কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি লাখো মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, স্মৃতি ও ক্ষতির ইতিহাস।
কণ্ঠশিল্পী শাহীন সামাদ মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের মনোবল ধরে রাখতে গান ব্যবহারের অভিজ্ঞতা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, সেই সময়ের সাংস্কৃতিক সংগ্রামে গান ছিল প্রতিরোধেরই এক রূপ।
শরণার্থী জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন শঙ্কর লাল সাহা ও মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ ফারাজি। তাদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে দেশ ছাড়ার যাত্রা, আশ্রয়ের অনিশ্চয়তা এবং যুদ্ধের দিনে সাধারণ মানুষের টিকে থাকার লড়াই।
‘স্মৃতি ৭১’-এর মাহবুব জামান বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় গান, কবিতা ও শিল্প কেবল বিনোদন ছিল না; প্রশিক্ষণকেন্দ্রে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গিয়ে শিল্পীরা তাঁদের মনোবল ধরে রাখার মাধ্যম হয়ে উঠেছিলেন।’
অনুষ্ঠানের বাইরে দেশের স্বনামধন্য চিত্রশিল্পীরা ক্যানভাসে তুলে ধরেন শরণার্থী জীবনের নানা খণ্ডচিত্র। যুদ্ধ, দেশত্যাগ, পথের ক্লান্তি, আশ্রয় ও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা তাঁদের তুলিতে নতুন করে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
আবৃত্তি, গান, প্রামাণ্যচিত্র, প্রত্যক্ষ বয়ান ও চিত্রকলার সমন্বয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি একাত্তরের শরণার্থী সংকটকে শুধু অতীতের ঘটনা হিসেবে নয়, মানুষের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দেখার একটি পরিসর তৈরি করে।




