প্রয়াণদিবসে ফিরোজা বেগমকে স্মরণ
আমাদের হৃদয়ের আনন্দবসন্ত

ফিরোজা বেগম
ফিরোজা বেগমের জন্ম ১৯৩০ সালের ২৮ জুলাই, এক পূর্ণিমার রাতে, ফরিদপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। পিতা খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইসমাইল ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী ও ব্রিটিশ সরকারের কৌঁসুলি, মা বেগম কওকাবুন্নেসা ছিলেন সংগীতানুরাগী ও সুমিষ্ট কণ্ঠের অধিকারী। ছোটবেলা থেকেই ফিরোজা ছিলেন অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী—পড়ালেখা, খেলাধুলা, গান, অভিনয়, আঁকা, সবকিছুতেই তিনি প্রথম। স্কুলের পুরস্কার বিতরণীতে তার দুহাত ভরে যেত পুরস্কারে। তবে গানের প্রতি ছিল তার আলাদা এক টান। বাড়ির ভাঁড়ার ঘরে পুরনো রেকর্ড আর একটি কলের গান ছিল, সেখানেই শুরু তার সংগীতের প্রাথমিক পাঠ। একদিন গান শুনতে শুনতে এতটাই আনমনা হয়েছিলেন যে কাজের লোকেরা কখন ভাঁড়ার ঘরে তালা লাগিয়ে দিয়েছে তিনি টেরই পাননি, কিন্তু তাতে কোনো দুঃখ ছিল না, বরং ভেবেছিলেন—মন্দ কী, একা একা তো গান শোনা হবে! ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই অল ইন্ডিয়া রেডিওতে গান গেয়ে সাড়া ফেলেছিলেন তিনি, আর খুব অল্প বয়সেই নামজাদা গ্রামোফোন কোম্পানি এইচএমভি থেকে তার রেকর্ড প্রকাশ পেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সবাইকে। ফিরোজা বেগমের বয়স যখন নয়-দশ বছর, তখনই এক মজলিসে তিনি গান শুনিয়েছিলেন এক টুপি পরা, বড় চুলের মানুষকে। পরে মামা বলেছিলেন, জানিস, উনি কে? বিখ্যাত কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সেদিন নজরুল ছোট্ট ফিরোজার গান শুনে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এ গান তুমি শিখলে কেমন করে? জবাবে ফিরোজা বলেছিলেন, কালো কালো রেকর্ড শুনে নিজে নিজেই শিখেছি। সুস্থ নজরুলের সান্নিধ্য তিনি পান প্রায় আড়াই বছর, জাতীয় কবির কাছ থেকে সরাসরি তালিম নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল তার। নজরুলের গানের প্রতি এতটাই আকৃষ্ট হয়ে পড়েন যে অন্য সব ধরনের গান ছেড়ে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নজরুলসংগীতেই নিমগ্ন করেন, পরিচিত হন ‘বিদ্রোহী কবির বিদ্রোহী শিষ্যা’ রূপে।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে কলকাতায় চিত্ত রায়ের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগীত শিক্ষা শুরু করেন ফিরোজা, আর এক বছরের মধ্যেই তৎকালীন উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সুরকার ও সংগীত পরিচালক কমল দাশগুপ্তের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় তার উচ্চতর সংগীত শিক্ষা। ১৯৪২ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে কলকাতার বিখ্যাত কলম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি থেকে তার প্রথম গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়—‘মরুর বুকে জীবনধারা কে বহাল’—যা বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গে হু হু করে বিক্রি হয়ে যায়। এরপর একে একে আরও রেকর্ড, আর সুরকার ও শিল্পীর সেই সম্পর্ক একদিন পরিণয়ের বাঁধনে গাঁথা হয়। ১৯৫৬ সালে ফিরোজা বেগম বিয়ে করেন কমল দাশগুপ্তকে, যদিও এই বিয়েকে সহজে মেনে নিতে পারেনি তার পরিবার, কিন্তু নিজের সত্যকে সব সময়ই অগ্রাধিকার দিয়েছেন তিনি—এটাই ছিল তার জীবনের নীতি। খায়রুল আনাম শাকিলের মূল্যায়ন এখানে প্রাসঙ্গিক, ‘একটা মুসলিম পরিবারের মেয়ে হয়ে সেই সময়ে নানা প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে দুই বাংলায় সমান জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন তিনি। এটা সত্যিই বিস্ময়কর।’










