প্রয়াণ দিবসে যতীন সরকারকে স্মরণ উদীচীর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গান, আবৃত্তি ও স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাবেক সভাপতি, দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক যতীন সরকারকে স্মরণ করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী (একাংশ)। তার প্রথম প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাজধানীর পুরানা পল্টনের কমরেড মণিসিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্টের মিলনায়তনে এ স্মরণসভার আয়োজন করা হয়।
স্মরণসভার শুরুতে অধ্যাপক যতীন সরকারের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর উদীচীর সঙ্গীত বিভাগের শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’।
উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের (একাংশ) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিমের সভাপতিত্বে শুরু হয় আলোচনা পর্ব। এতে অধ্যাপক যতীন সরকারের জীবন, আদর্শ ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম সিদ্দিক রানা, সহ-সভাপতি প্রবীর সরদার, সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে, সহ-সাধারণ সম্পাদক সঙ্গীতা ইমাম, নিবাস দে ও বিমল মজুমদার।
অমিত রঞ্জন দে বললেন, ‘১৯৬০-এর দশকে ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন অধ্যাপক যতীন সরকার। তিনিসহ কয়েকজন প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব একত্রিত হয়ে ময়মনসিংহে উদীচীর যাত্রা শুরু করেন। তার নেতৃত্বেই পুরো জেলায় উদীচীর কার্যক্রম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮০-এর দশক থেকেই অধ্যাপক যতীন সরকার উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০০৩ সালে উদীচীর সভাপতি নির্বাচিত হন। টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর ২০০৮ সালে সভাপতি পদ থেকে বিদায় নেন তিনি।’
অমিত রঞ্জন দে বলেছেন, ‘সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়ার পরও আমৃত্যু তিনি উদীচীর আদর্শিক লড়াই-সংগ্রামের অন্যতম পথপ্রদর্শক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। যেকোনো সংকটে বা সংগ্রামে দেশ ও বিদেশে উদীচীর হাজারো শিল্পী-কর্মীর অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন অধ্যাপক যতীন সরকার।’
মাহমুদ সেলিম বললেন, ‘অধ্যাপক যতীন সরকার আজীবন সামাজিক নিপীড়ন, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ সাম্যবাদী, অসাম্প্রদায়িক, মৌলবাদমুক্ত দেশ গঠনে সচেষ্ট থেকেছেন। তিনি মনে করতেন, সমাজ থেকে দুর্নীতি, অবিচার, বৈষম্য ইত্যাদি দূর না হওয়া পর্যন্ত দারিদ্র্য কমিয়ে আনা যাবে না। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন করা বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত বলে মনে করতেন অধ্যাপক যতীন সরকার।’
তিনি বলেছেন, ‘অধ্যাপক যতীন সরকারের দেখানো পথেই কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাবে উদীচী।’
অনুষ্ঠানে একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন শিখা সেন গুপ্তা। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিজয় বণিক। উদীচী কেন্দ্রীয় সঙ্গীত বিভাগের শিল্পীদের সমবেত পরিবেশনায় ‘তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে’ গানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় স্মরণসভার কার্যক্রম। পুরো আয়োজনটি সঞ্চালনা করেন কংকন নাগ।
১৯৩৬ সালের ১৮ আগস্ট নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন অধ্যাপক যতীন সরকার। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করলেও ছোটবেলা থেকেই তার জ্ঞানার্জনের অদম্য স্পৃহা ছিল। ১৯৫৪ সালে মেট্রিক পাস করেন তিনি। আইএ পাসের পর ভর্তি হন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে। ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাস করার পর প্রথমে গৌরীপুর হাইস্কুলে এবং ১৯৬৪ সালে ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও গ্রন্থকার হিসেবে জাতির মনন গঠনে অসামান্য অবদান রেখেছেন অধ্যাপক যতীন সরকার। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে ‘পাকিস্তানের জন্ম মৃত্যু-দর্শন’, ‘বাংলাদেশী কবি গান’, ‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’, ‘বাঙালি সমাজতন্ত্র ঐতিহ্য’, ‘সাংস্কৃতিক সংগ্রাম’, ‘মানব স্বপ্ন এবং সমাজ বিপ্লব’, ‘আমাদের সাংস্কৃতিক দিগ্দিগন্ত’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ২০১০ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন তিনি। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন অধ্যাপক যতীন সরকার।
দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগে ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অধ্যাপক যতীন সরকার।







