আজ ২২ শ্রাবণ, রবি ঠাকুরের চলে যাওয়ার দিন

আজ ২২ শ্রাবণ। বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণ দিবস। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে বর্ষার ঋতুতেই কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা সাহিত্যের এই অমর স্রষ্টা।
কবিগুরুর প্রিয় ঋতু ছিল বর্ষা। অজস্র কবিতা, গান ও গদ্যরচনায় তিনি বাংলার বর্ষার সৌন্দর্য, আবেগ ও প্রকৃতিকে অসাধারণ মাধুর্যে তুলে ধরেছেন। ৮০ বছর বয়সে তাঁর শারীরিক প্রয়াণ ঘটলেও বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর সৃষ্টির আবেদন এখনো নতুন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিক রূপ নির্মাণে রবীন্দ্রনাথের অবদান অনন্য। তাঁর হাত ধরেই বাংলা সাহিত্য নতুন যুগে প্রবেশ করে। বাংলা গদ্যের আধুনিকায়নে তিনি ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ; বাংলা ছোটগল্পের বিকাশেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গান, সুর, দর্শন ও চিত্রকলায় তাঁর বহুমাত্রিক সৃজনশীলতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
রবীন্দ্রনাথ শুধু সাহিত্যিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালির মনন ও চেতনার অন্যতম প্রধান নির্মাতা। বাঙালির জীবনাচরণ, অনুভূতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর কবিতা ও গান গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ তাঁরই রচনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর গান বাঙালিকে সাহস, প্রেরণা ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করেছে।
বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেন রবীন্দ্রনাথ। ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে ১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনিই প্রথম এশীয় নোবেলজয়ী সাহিত্যিক। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন পরিচিতি লাভ করে।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি শিক্ষা ও সমাজকল্যাণেও রবীন্দ্রনাথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পরে গ্রামোন্নয়নের লক্ষ্যে শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বভারতী গড়ে তোলার মাধ্যমে শিক্ষাকে সমাজ ও মানুষের কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেন। জমিদারি পরিচালনার সময় কৃষক ও পল্লির মানুষের উন্নয়নেও তিনি নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।
১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগ করে রবীন্দ্রনাথ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ করেন। এ ঘটনাও তাঁর দেশপ্রেম ও মানবিক চেতনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
বিশ্বভ্রমণেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অনন্য। ১৮৭৮ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত তিনি ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ সফর করেন। তাঁর ভ্রমণ, বক্তৃতা ও লেখালেখির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য ও ভারতীয় সংস্কৃতি বিশ্বের নানা প্রান্তে পরিচিতি পায়।
রবীন্দ্রনাথের রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত এবং ‘জনগণমন’ ভারতের জাতীয় সংগীত। দুই দেশের জাতীয় জীবনের সঙ্গেও তাঁর সৃষ্টির এই গভীর সংযোগ তাঁকে আরও অনন্য করে তুলেছে।





