বাংলাদেশের রবীন্দ্রভুবনে

রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষের ভিটা, খুলনা
বাইশে শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস। দিনটি সামনে রেখে বাংলাদেশে কবির বিচরণ, জমিদারি, শ্বশুরবাড়ি এবং পূর্বপুরুষের ভিটেমাটির খোঁজ ভ্রমণপ্রেমী পাঠকের জন্য। লেখা ও ছবি : বাবু আহমেদ
শিলাইদহ কুঠিবাড়ি
দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক, রবীন্দ্রানুরাগী শিলাইদহ কুঠিবাড়ি দেখে গেছেন, আমি চোখ রেখেছি ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারের মধ্য দিয়ে।
এই শিলাইদহ কুঠিবাড়িতেই কবিগুরুর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলোর একটি বড় অংশ কেটে গেছে; রচনা করেছেন কালজয়ী গল্প, গান ও কবিতা। গড়াই নদীর বোটে বসে তার জীবনের দুঃখ-কষ্টগুলো আমাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছেন কাগজ ও কলমের মাধ্যমে।
এই গ্রামটির প্রাচীন নাম খোরশেদপুর। ঠাকুররা কিনে নেওয়ার আগে এ গ্রামে ছিল একটি নীলকুঠি। শোনা যায়, সেই কুঠিতে শেলি নামে এক নীলকর সাহেব থাকতেন। পরে পদ্মা ও গড়াই নদীর সঙ্গমস্থলে সৃষ্টি হয় এক দহ, সেই দহের সঙ্গে শেলির নাম জুড়ে এ গ্রাম দাঁড়াল শেলিদহ বা শিলাইদহ। কবিগুরু শিলাইদহে টানা একটি যুগ (১৮৮৯-১৯০১) কাটিয়েছেন। এখানেই তিনি শান্তিনিকেতন বিশ্ববিদ্যালয় করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু কিছু প্রভাবশালী কট্টর হিন্দু ব্যক্তির বাধায় তা করা সম্ভব হয়নি। স্ত্রীর মৃত্যুর পর কবি আবারও শিলাইদহে ফেরেন। গ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের খাজনা মওকুফ করে দেন।
যেভাবে যাবেন : ঢাকার গাবতলী থেকে বাসে যাওয়া যাবে কুষ্টিয়া শহর। সেখান থেকে অটোরিকশায় সোজা কবিগুরুর কুঠিবাড়িতে পৌঁছে যাবেন।
টেগর লজ
কুঠিবাড়ি দেখে চলে আসবেন আবার কুষ্টিয়া শহরেই। শহরের পূর্বদিকে মিলপাড়ায় বিচিত্র স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এ দোতলা বাড়ি ‘টেগর লজ’। এ বাড়িটিও কোম্পানি আমলে নির্মিত লাল রঙের। ১৯১৯-২২ সাল পর্যন্ত কবি কলকাতা থেকে শিলাইদহ যাওয়া-আসার পথে টেগর লজে অবস্থান করতেন। যত দূর জানা যায়, গত শতকের সত্তর দশকের প্রথমে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে টেগর লজ নিলামে কিনে নেন আলাউদ্দিন নামে একজন ব্যবসায়ী। ’৭৬ সালে তার কাছ থেকে বাড়িটি কেনেন আব্দুল গফুর। আমি ’৮৪ সালের মার্চ মাসে রবীন্দ্রনাথের টেগর লজে প্রথম পা রাখি। তখন সেখানে একটি কালো কাঠের বিশাল খাট এবং কাপড় রাখার একটি আলনা দেখতে পাই। পাশেই ছিল কালো কাঠের চেয়ার-টেবিল। আমি সেই চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ ভেবেছিলাম, কবিগুরু এ চেয়ারে বসে নিশ্চয়ই অনেক কথা লিখেছেন।
যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া শহরে পৌঁছে যেকোনো বাহনে চেপে টেগর লজে যেতে পারবেন।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর কবি আবারও শিলাইদহে ফেরেন। গ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের খাজনা মওকুফ করে দেন
পতিসর কাছারিবাড়ি
১৮৯১ সালের জানুয়ারিতে নওগাঁর পতিসর জমিদারির দায়িত্বে আসেন কবি। পতিসরে বসবাসের সময় কাছারিবাড়িতে থেকেছেন ও জমিদারির কাজকর্ম দেখাশোনা করেছেন আর ঘুরে বেড়িয়েছেন। এ পতিসরে বসেই কবি ‘তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে’ লেখেন। এ ছাড়া ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে’ এ ধরনের অসাধারণ প্রকৃতির কবিতা উনি লিখেছিলেন এখানে বসে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে ১৯৩৭ সালে আবার নিজ জমিদারিতে আসেন কবি। তখন তার শরীরে বার্ধক্যের ছোঁয়া, কিছুদিন অবস্থান করে বিদায় নেন। এটাই ছিল পতিসরে কবির শেষ যাত্রা, সম্ভবত এই বাংলায়ও কবির শেষ আসা।
যেভাবে যাবেন : গাবতলী থেকে বাসে নওগাঁ হয়ে পতিসরে চলে যাওয়া যাবে।
শাহজাদপুর কাছারিবাড়ি
শাহজাদপুরে কবি প্রথম আসেন ১৮৯০ সালে। তারপর থেকে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত জমিদারি দেখাশোনার জন্য শাহজাদপুর এলে এ বাড়িতে কবি অবস্থান করতেন। পাশের যে ভবনটিতে বসে কবি খাজনা আদায় করতেন, সেটি এখন ধ্বংসপ্রায়। তার সময়ে লাগানো বিশাল বকুলগাছটি যত্নের অভাবে ভেঙে গেছে। এ বকুলতলায় বসে কবি কবিতা লিখতেন।
ডিহি শাহজাদপুরের জমিদারি নাটোরের রানী ভবানীর জমিদারির অংশ ছিল। ১৮৪০ সালে শাহজাদপুর জমিদারি নিলামে উঠলে কবির পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর মাত্র ১৩ টাকা ১০ আনায় এ জমিদারি কিনে নেন। জমিদারির সঙ্গে সঙ্গে শাহজাদপুর কাছারিবাড়িটিও ঠাকুর পরিবারের হস্তগত হয়েছিল। ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এ ভবনটির ছাদের ওপর প্যারাপেট দেয়ালে পোড়ামাটির কাজ বিশেষভাবে চোখে পড়ে। ১৯৬৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ভবনটি সংরক্ষণ করে। বর্তমানে এটি রবীন্দ্র জাদুঘর।
যেভাবে যাবেন : ঢাকার গাবতলী থেকে শাহজাদপুর চলে যাবেন। সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত রিকশায় সোজা চলে আসা যায় রবীন্দ্রনাথের কাছারিবাড়ি।
রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ি
খুলনার সীমান্তবর্তী ফুলতলা থানার খুলনা-যশোর মহাসড়কে পাঁচ কিলোমিটার গেলেই দক্ষিণ ডিহি গ্রাম। এখানেই বাস করত রায় চৌধুরী পরিবার। এ পরিবারেই বেণিমাধব চৌধুরীর ঘরে জন্ম ভবতারিণী দেবী। ১৮৮৩ সালের ৮ ডিসেম্বর এ ভবতারিণী দেবীর সঙ্গেই বিয়ে হয় রবীন্দ্রনাথের। বিয়ের পর কবি তার নাম বদলে রাখেন মৃণালিনী দেবী। ইট-সুরকির তৈরি ভবনের নিচতলায় চারটি, ওপর তলায় দুটি কামরা। দোতলার ছাদের ব্যালকনিতে ক্ষয়প্রাপ্ত কারুকাজ এখনো আছে। সিঁড়ি ও অন্যান্য স্থানের নকশাগুলো বিলুপ্ত। সরকারের তত্ত্বাবধানে থাকা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ি রক্ষা পায়নি।
যেভাবে যাবেন : খুলনার বাসস্ট্যান্ড থেকে যেকোনো বাসে ফুলতলা। সেখান থেকে তিন চাকার ভ্যানে কবিগুরুর শ্বশুরবাড়ি।
রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষের ভিটা
রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিবিজড়িত ভিটেটি খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার পিঠভোগ গ্রামে (ফকিরহাটসংলগ্ন, বাগেরহাট থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে)। স্থানীয়ভাবে এটি ‘কুশারী বাড়ি’ নামে পরিচিত। অষ্টম শতকে রামগোপাল কুশারী এটি প্রতিষ্ঠা করেন। পিরালি ব্রাহ্মণ কুশারী পরিবারের এক সদস্য পঞ্চানন কুশারী পিঠভোগ ছেড়ে কলকাতায় পাড়ি জমান; তবে একটি অংশ ভিটেমাটি আঁকড়ে এখানেই থেকে যান।
১৯৯২ সালে বাড়িটি ভাঙা শুরু হয় এবং ১৯৯৪ সালে খুলনার এক ব্যবসায়ী মাত্র ২ লাখ ২৪ হাজার টাকায় ভবনটি কিনে ইট-কাঠসহ পুরোটাই গুঁড়িয়ে দেন। পরে ১৯৯৫ সালে পরিবারের ১৬তম বংশধর গৌর চন্দ্র কুশারী ১৫ শতক জমি ২৫ হাজার টাকায় সরকারের কাছে বিক্রি করেন। অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০০৬ সালে সরকারি উদ্যোগে এখানে ‘রবীন্দ্র সংগ্রহশালা’ এবং ২০১৩ সালে একটি প্রবেশদ্বার নির্মিত হয়।
যেভাবে যাবেন : ঢাকার গাবতলী থেকে বাসে চড়ে সোজা বাগেরহাট। সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত রিকশায় পিঠভোগ গ্রামে কুশারী বাড়ি।
[আজকাল প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কারের নামে ঐতিহাসিক ভবনগুলোকে এমনভাবে রঙ করা হয়, যাতে মনে হয় অতীতটাকেই মুছে ফেলা হচ্ছে। প্রায় তিন দশক আগে যখন ক্যামেরায় এসব ভবন ধারণ করি, তখনো তাদের আদি রূপ অক্ষুণ্ণ ছিল।]








