আজ রবি অস্তের দিন

‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান’— মৃত্যুকে এমন নিবিড় ভালোবাসা ও আত্মসমর্পণের ভাষায় খুব কম কবিই উচ্চারণ করতে পেরেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে মৃত্যু ছিল না জীবনের সমাপ্তি; ছিল অনন্তের পথে যাত্রা। তাই তার প্রয়াণ দিবসও শুধু শোকের দিন নয়; বরং তার সৃষ্টির আলোয় ফিরে দেখার এক গভীর উপলক্ষ। আজ বৃহস্পতিবার, ২২ শ্রাবণ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম স্রষ্টা, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী। দিনটি উপলক্ষে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয়েছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও রবীন্দ্রসংগীতের আসর।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এক অনন্য বহুমাত্রিক প্রতিভা। কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য, ভ্রমণকাহিনি, চিত্রকলাসহ শিল্প-সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় তিনি রেখে গেছেন কালজয়ী অবদান। তার দুই হাজারেরও বেশি গান আজ ‘রবীন্দ্রসংগীত’ নামে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার রচনায় প্রকৃতি, প্রেম, মানবতা, স্বাধীনতা, সাম্য ও বিশ্বমানবতার চিরন্তন আহ্বান সমানভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদা সুন্দরী দেবীর ১৫ সন্তানের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন চতুর্দশ। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে তার জন্ম। সাহিত্য-সংস্কৃতিমণ্ডিত পারিবারিক পরিবেশ এবং বাংলার নদী, প্রকৃতি ও পল্লীজীবনের অভিজ্ঞতা তার জীবনদর্শন ও সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে তিনি শুধু প্রথম বাঙালিই নন, এশিয়ারও প্রথম নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। তার এই অর্জন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে এক নতুন মর্যাদা এনে দেয়।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি শিক্ষা, কৃষি, পল্লী উন্নয়ন ও সমাজ সংস্কারেও তার অবদান ছিল অনন্য। শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বভারতী। কৃষকদের জন্য চালু করেন কৃষিঋণ ব্যবস্থা এবং গ্রামীণ উন্নয়নে নেন নানা উদ্যোগ। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া নাইটহুড উপাধি ত্যাগ করে তিনি মানবিক প্রতিবাদের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল। তার লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, আর ‘জন গণ মন’ ভারতের জাতীয় সংগীত। বিশ্বের ইতিহাসে দুটি দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা হিসেবে তিনি এক অনন্য মর্যাদার অধিকারী।
বিশ্বকবির ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে আজ সন্ধ্যা ৭টায় ধানমন্ডির ছায়ানট মিলনায়তনে ছায়ানট মঞ্চস্থ করবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গীতিনাট্য ‘শ্যামা’। অনুষ্ঠানটি সবার জন্য উন্মুক্ত। পাশাপাশি ছায়ানটের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে এটি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
বাইশে শ্রাবণ শুধু একজন কবির মৃত্যুস্মরণের দিন নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও মানবিক চেতনার উৎসে ফিরে যাওয়ারও দিন। সময় বদলেছে, বদলেছে প্রযুক্তি ও জীবনযাত্রা; কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তার জীবনাবসান ঘটেছে ৮৫ বছর আগে, অথচ তার সৃষ্টির আলো আজও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানবতা, সৌন্দর্যবোধ ও মুক্তচিন্তার পথ আলোকিত করে চলেছে। কবির প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে আগামীর সময়ের শুক্রবারের সাহিত্য আয়োজন কাজলরেখায় থাকছে বিশেষ আয়োজন।




