উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মরণে
সুর ছিল যার পরম

উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ
উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ— আমাদের ধ্রুপদী সঙ্গীতের এমন একটি নাম, যিনি সুরের সাধনায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে এ দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের পাতায় অক্ষয় হয়ে আছেন। শুধু বাঙালির গৌরব নন, সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন সারা দুনিয়ায়। তার জীবন কোনো সাধারণ মানুষের জীবনকথা নয়; এ এক বিরাট তপস্যার উপাখ্যান, যেখানে কিশোর বয়সে ঘরছাড়া হয়ে সুরের খোঁজে নেমেছিলেন, আর ফিরে এসেছিলেন সুরসম্রাটের মুকুট মাথায় নিয়ে। তিনি বলতেন, 'সঙ্গীত আমার জাতি আর সুর আমার গোত্র'— এই একটি বাক্যেই যেন ধরা আছে তার সমগ্র জীবনের দর্শন, সাধনার নির্যাস।
সেসময়ের ত্রিপুরা প্রদেশের শিবপুর গ্রাম (বর্তমানে বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্তর্গত নবীনগর উপজেলায়) এর এক খ্যাতিমান সঙ্গীত পরিবারে আনুমানিক ১৮৬২ সালের ৮ অক্টোবর (কোনো কোনো সূত্র মতে এপ্রিল মাসে) জন্ম নিয়েছিলেন আলাউদ্দিন খাঁ। তার পিতা সবদর হোসেন খাঁ— যিনি সদু খাঁ নামেই বহুল পরিচিত— ছিলেন একজন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ; মাতার নাম ছিল সুন্দরী বেগম। ছেলের ডাকনাম ছিল আলম। পারিবারিক আবহে সঙ্গীতের প্রাথমিক পাঠ শুরু হয় বড় ভাই ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁর কাছে। শৈশবেই তার প্রতিভার বিচ্ছুরণ দেখে পরিবারের সবাই বুঝেছিলেন, এই শিশু একদিন সঙ্গীতের আকাশে জ্বলবে তারা হয়ে। পরে তার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্গীতগুরু হিসেবে আবির্ভূত হন আগরতলা রাজদরবারের সভাসঙ্গীতজ্ঞ, তানসেনের কন্যাবংশীয় রাবাবী উস্তাদ কাশিম আলী খাঁ। এই গুরুপরম্পরাই যেন পূর্বাভাস দিয়েছিল— সুরের যে পথে আলাউদ্দিন পা রাখলেন, তা তানসেনী ধারারই পুণ্যস্রোত।
কিন্তু আলাউদ্দিনের মন ছিল উদার, বাঁধনহারা; সুরের টানে গৃহের চৌহদ্দি পেরিয়ে ছুটে যেতে চাইত বহুদূর। মাত্র দশ বছর বয়সে এমনই এক অজানা আকাঙ্ক্ষায় বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন, যোগ দিলেন এক যাত্রাদলের সঙ্গে। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে ঘুরে সেই পথে কাটানো জীবনেই তার পরিচয় ঘটে বাংলার প্রাণের সঙ্গীত— জারি, সারি, বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তন, পাঁচালি— প্রায় সব লোকধারার সঙ্গে। এই অভিজ্ঞতা ছিল তার সঙ্গীত জীবনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়; লোকজ সুরের গভীরে শেকড় গেঁথে দিয়েছিল, যা পরবর্তীকালে তার শাস্ত্রীয় সাধনাকে দিয়েছিল মাটির ঘ্রাণ ও প্রাণের স্পন্দন। লোকায়ত সঙ্গীতের এই অমৃতপান তাকে শিখিয়েছিল যে, সঙ্গীত কেবল রাগের শাস্ত্র নয়, তা মানুষের প্রাণের ভাষা, সমাজের আয়না।
কলকাতায় পৌঁছে মোড় ঘুরে যায় তার জীবনের। প্রখ্যাত সঙ্গীত সাধক গোপালকৃষ্ণ ভট্টাচার্য— লোকমুখে যিনি নুলো গোপাল নামে পরিচিত— তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন আলাউদ্দিন খাঁ। কিন্তু গুরু শর্ত দিলেন, অন্তত বারো বছর একটানা সাধনা করতে হবে। নিষ্ঠাবান শিষ্য অকুণ্ঠচিত্তে রাজি! তবে ভাগ্য প্রসন্ন হলো না; সাত বছর শেষ হওয়ার আগেই প্লেগের থাবায় চিরবিদায় নিলেন গোপালকৃষ্ণ ভট্টাচার্য। গুরুর মৃত্যুতে পিতৃহীনের মতো শোকে পাথর হয়ে রইলেন কিছুদিন আলাউদ্দিন, কিন্তু থেমে থাকল না তার সাধনা। কণ্ঠসঙ্গীতের পথ ছেড়ে তিনি নিমগ্ন হলেন যন্ত্রসঙ্গীতের অফুরান ভুবনে। স্টার থিয়েটারের সঙ্গীত পরিচালক অমৃতলাল দত্ত ওরফে হাবু দত্তের কাছে শিখলেন বাঁশি, পিকলু, সেতার, ম্যান্ডোলিন, ব্যাঞ্জোসহ দেশি-বিদেশি নানা বাদ্যযন্ত্র। লবো সাহেব নামে এক গোয়ানিজ ব্যান্ড মাস্টারের কাছে পাশ্চাত্য রীতিতে বেহালা, অমর দাসের কাছে দেশীয় পদ্ধতির বেহালা, মিসেস লবোর কাছে স্টাফ নোটেশন, হাজারী উস্তাদের কাছে সানাই, নাকারা, টিকারা, জগঝম্প এবং নন্দবাবুর কাছে মৃদঙ্গ ও তবলা— এইভাবে একে একে তিনি সর্ববাদ্য বিশারদ হয়ে উঠলেন। এমনকি কিছুদিন ছদ্মনামে মিনার্ভা থিয়েটারে তবলা বাদকের কাজও করেছেন। এই বহুমুখী সাধনা তাকে দিয়েছিল সঙ্গীতের প্রতি এক বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি; তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, প্রতিটি বাদ্যযন্ত্রের নিজস্ব ভাষা আছে, আর সেই ভাষা আয়ত্ত করলেই কেবল প্রকৃত শিল্পী হওয়া যায়।
কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার জগৎকিশোর আচার্য চৌধুরীর সঙ্গীত সভায়। সেখানে বিখ্যাত সরোদিয়া উস্তাদ আহমদ আলী খাঁর সরোদ বাদন শুনে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেলেন আলাউদ্দিন। জমিদারের অনুরোধে আহমদ আলী খাঁ তাকে শীষ্যরূপে গ্রহণ করলেন এবং জগৎকিশোর উপহার দিলেন একখানা সরোদ। এই হলো সরোদের সঙ্গে তার আত্মার বাঁধন, যে বাঁধন আর ছিন্ন হয়নি কোনোদিন। পাঁচ বছর আহমদ আলীর কাছে তালিম নেওয়ার পর গুরুর নির্দেশে গেলেন রামপুরে, তানসেন বংশীয় মহান সঙ্গীত সাধক উস্তাদ ওয়াজির খাঁর কাছে। রামপুরের নবাব হামেদ আলী খাঁর দরবার-সঙ্গীতজ্ঞ উস্তাদ ওয়াজির খাঁর কাছে দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে সেনিয়া ঘরানার অতি সূক্ষ্ম ও দুরূহ সব কলাকৌশল আয়ত্ত করলেন তিনি। এমন গুরুর কাছে এত লম্বা সময় ধরে সাধনা শুধু বিরল নয়, বিস্ময়কর। এই দীর্ঘ শিক্ষাজীবনই আলাউদ্দিনকে গড়ে তুলেছিল এক অনন্য প্রতিষ্ঠানে, এক চলমান বিশ্ববিদ্যালয়ে।
১৯১৮ সালে নবাব তাকে মধ্য প্রদেশের মাইহার রাজ্যে প্রেরণ করেন। মাইহারের রাজা ব্রিজনারায়ণ রায় আলাউদ্দিন খাঁকে নিজের সঙ্গীতগুরুর আসনে বসালে তিনি মাইহারে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই জন্ম নিল নতুন এক ঘরানা, যা মাইহার ঘরানা বা আলাউদ্দিন খাঁ ঘরানা নামে সারা বিশ্বে প্রসিদ্ধি লাভ করে। বেরিলির পীরের প্রভাবে তিনি যোগ, প্রাণায়াম ও ধ্যানের সাধনাতেও নিজেকে নিমগ্ন করেছিলেন; ফলে সঙ্গীত ও অধ্যাত্মবাদ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল তার জীবনে। সরোদে তিনি ‘দিরি দিরি’র পরিবর্তে ‘দারা দারা’ সুরক্ষেপণ পদ্ধতি চালু করলেন— এ ছিল সরোদ বাদনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সেতারে সরোদের বাদনরীতি প্রয়োগ করে সেতার বাদনেও আনলেন নতুন প্রাণ।
শুধু বাদনেই নয়, তার সৃষ্টিশীল প্রতিভা ফুটে উঠল নতুন নতুন রাগের জন্মে— হেমন্ত, দুর্গেশ্বরী, মেঘবাহার, প্রভাতকেলী, হেম-বেহাগ, মদনমঞ্জুরী, মোহাম্মদী (আরাধনা), মান্ঝ খাম্বাজ, ধবলশ্রী, সরস্বতী, ধনকোশ, শোভাবতী, রাজেশ্রী, চণ্ডিকা, দীপিকা, মলয়া, কেদার মান্ঝ, ভুবনেশ্বরী— এ তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। প্রতিটি রাগের আরোহ-অবরোহ নির্মাণে তিনি এনেছিলেন অভিনবত্ব ও শাস্ত্রসম্মত নিখুঁত কারুকাজ। তার সৃষ্ট রাগগুলোর মধ্যে কয়েকটির পরিচয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সহধর্মিণী মদিনা বেগমের নামে সৃষ্ট ‘মদন মঞ্জরী’ প্রাতঃকালে পরিবেশিত হতো, যার আরোহী ছিল সা গা ক্ষা ধা নি ধা নি পা এবং অবরোহী ছিল সা নি ধা পা মা গা রে সা। ভ্রাতুষ্পুত্র মোবারক হোসেন খানের অনুরোধে রচিত ‘মোহাম্মদী (আরাধনা)’ও প্রাতঃকালীন রাগ, যার আরোহী সা রে গা মা পা নি সা এবং অবরোহী সা নি পা মা গা রে সা। সন্ধ্যাকালীন রাগ ‘শোভাবতী’র আরোহী ছিল সা, গা মা ধা নি সা এবং অবরোহী ছিল সা নি ধা মা গা সা। সন্ধ্যাকালের আরেক রাগ ‘ধবলশ্রী’র আরোহী সা খো মা পা নি সা এবং অবরোহী সা নি ধা পা ক্ষা গা ঋে সা। স্ত্রী মদিনা বেগমকে উৎসর্গ করা প্রাতঃকালের রাগ ‘ভুবনেশ্বরী’র আরোহী সা রে গা মা পা ধা সা এবং অবরোহী সা ধা পা মা গা রে সা। গভীর রাত্রিতে পরিবেশিত ‘হেম বেহাগ’ রাগের আরোহী ছিল সা গা মা পা নি সা এবং অবরোহী ছিল সা নি ধা পা মা গা রে সা। আবার রাত্রিবেলার কাফি ঠাটের রাগ ‘সরস্বতী’র আরোহী ছিল সা রে জ্ঞা মা ধা মা ধা র্পা এবং অবরোহী ছিল সা নি ধা মা জ্ঞা মা জ্ঞা, রে সা। এইসব রাগের নির্মাণে তার শাস্ত্রজ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতার অপূর্ব সমন্বয় লক্ষ করা যায়। তিনি প্রচুর গানও রচনা করেছিলেন, যেখানে ব্যবহার করতেন তার ডাকনাম ‘আলম’ ভণিতা। স্বরলিপিতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত; তার বহু গানের স্বরলিপি ‘সঙ্গীতবিজ্ঞান প্রবেশিকা’ গ্রন্থে নিয়মিত প্রকাশিত হতো, যা আজও সঙ্গীত শিক্ষার্থীদের কাছে অমূল্য সম্পদ। তার পরামর্শে তৈরি হলো নতুন বাদ্যযন্ত্র ‘চন্দ্রসারং’ ও ‘সুরশৃঙ্গার’। দেশি বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে গঠন করলেন ‘রামপুর স্ট্রিং ব্যান্ড’, যা ছিল অর্কেস্ট্রার এক দেশীয় রূপ, এক অভূতপূর্ব প্রয়াস।
উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর আরও এক মহান কীর্তি তার যোগ্য শিষ্যদের পরম্পরা। পুত্র আলী আকবর খাঁ, কন্যা রওশন আরা বেগম (অন্নপূর্ণা), ভাগ্নে রাজা হোসেন খান, ভ্রাতুষ্পুত্র বাহাদুর হোসেন খান, ফুলঝুরি খান, খাদেম হোসেন খান, মীর কাশেম খান, খুরশীদ খান এবং নাতি আশীষ খান ও ধ্যানেশ খান— প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল নক্ষত্র। এঁরা ছাড়াও পণ্ডিত রবি শঙ্কর, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, ভি. জি. যোগ, বসন্ত রায়, শ্রীপদ বন্দ্যোপাধ্যায়, পান্নালাল ঘোষ, রবিন ঘোষ, শরণ রাণী, নলীন মজুমদার, যতীন ভট্টাচার্য, রাজেশ চন্দ্র মৈত্র, ডেভিড পোদিআপ্পুহামি, ডব্লিউ. ডি. অমরদেব, তিমিরবরণ, ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য, দ্যুতিকিশোর আচার্য চৌধুরী, যামিনীকুমার চক্রবর্তী, রণেন দত্ত রাজা রায়, শচীন্দ্রনাথ দত্ত, শ্যামকুমার গাঙ্গুলী, সন্তোষ প্রামাণিক এবং স্বয়ং রাজা ব্রিজনারায়ণ রায়ের মতো বিশ্ববিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞরা তার সান্নিধ্যে এসে ধন্য হয়েছেন। এই শিষ্যবৃন্দের হাত ধরেই মাইহার ঘরানার সুর ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর কোণে কোণে। উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর তালিমের গুণেই তার পুত্র সরোদশিল্পী উস্তাদ আলী আকবর খান বিশ্ববিখ্যাত হয়েছেন এবং ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’ ও ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন; আর তার জামাতা সেতারশিল্পী পণ্ডিত রবিশঙ্কর বিশ্বখ্যাত হয়েছেন এবং ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’, ‘পদ্মবিভূষণ’ ও সর্বোচ্চ ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে সম্মানিত হয়েছেন। মাইহার রাজ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘মাইহার কলেজ অব মিউজিক’—যা ছিল তার সঙ্গীত জীবনের এক শ্রেষ্ঠ অবদান; সেখানে তিনি নিজেই ছিলেন সর্বেসর্বা পরিচালক। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমন্ত্রণে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতেও তিনি আমন্ত্রিত অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যা ছিল তার পাণ্ডিত্যের প্রতি আরেকটি বিরল স্বীকৃতি।
১৯৩৫ সালে বিশ্বখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্করের সঙ্গে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে আলাউদ্দিন খাঁ ভারতীয় রাগসঙ্গীতকে সর্বপ্রথম পাশ্চাত্যের শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করান। ইংল্যান্ডের রানি তাকে ‘সুরসম্রাট’ উপাধিতে ভূষিত করেন। উদয় শঙ্কর পরিচালিত নৃত্যভিত্তিক ধ্রুপদী ছবি ‘কল্পনা’য় আবহসঙ্গীতে সরোদ পরিবেশনের দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি। তবে কোনো উপাধিই তাকে স্পর্শ করতে পারেনি; তিনি ছিলেন সুরের কাছেই একান্ত আত্মসমর্পিত সাধক। ভারত সরকার ১৯৫২ সালে দিল ‘সঙ্গীত নাটক আকাদেমি সম্মান’, ১৯৫৮ সালে ‘পদ্মভূষণ’ এবং ১৯৭১ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’। বিশ্বভারতী ১৯৬১ সালে দিল ‘দেশিকোত্তম’ সম্মান। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেলেন সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব ল’ উপাধি। ব্রিটিশ সরকার দিয়েছিল ‘খাঁ সাহেব’ উপাধি। ১৯৫৪ সালে তিনিই প্রথম ভারত সরকারের সঙ্গীত নাটক আকাদেমির ফেলো নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আজীবন সদস্যপদ তার বাঙালি পরিচয়ের প্রতি এক বিশেষ সম্মানই বহন করে। এসব দুর্লভ সম্মান ও খেতাব সঙ্গীতবিদ্যায় আলাউদ্দিন খাঁর অসাধারণ কীর্তি ও সাফল্যকেই সূচিত করে।
শুধু সঙ্গীত সাধনাতেই নয়, সমাজসেবাতেও তিনি ছিলেন সমান নিবেদিতপ্রাণ। নিজের জন্মভূমি শিবপুর গ্রামে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন এবং গ্রামবাসীদের জন্য খনন করে দিয়েছিলেন একটি পুকুর। আজও সেই মসজিদ ও পুকুর তার স্মৃতিবহন করে চলেছে, যেন সুরের পাশাপাশি মানবসেবার অক্ষয় দৃষ্টান্ত হয়ে। এই মহান সাধকের জীবনের ওপর নির্মিত হয়েছে একাধিক প্রামাণ্যচিত্র। ১৯৬৩ সালে ঋত্বিক ঘটক পরিচালনা করেন ‘উস্তাদ আলাউদ্দীন খান’, আর ১৯৬৫ সালে হরিসাধন দাশগুপ্ত নির্মাণ করেন ‘বাবা আলাউদ্দীন খান’। ১৯৭১ সালে হাওয়ার্ড ওয়ার্থের পরিচালনায় নির্মিত হয় ‘রাগা’, যেখানে রবি শঙ্করের সঙ্গে উঠে আসে আলাউদ্দিন খাঁর জীবন ও শিক্ষার ছবি। ১৯৯৩ সালে সুনীল শানবাগের ‘মৈহার রাগ’ তাকিয়েছিল মাইহারে আলাউদ্দিন খানের বিধ্বস্ত ঐতিহ্যের দিকে; ছবিটি ১৯৯৪ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়।
১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রদেশের মাইহারে চিরবিদায় নেন এই সুরসম্রাট। কিন্তু তার রেখে যাওয়া সুর, ঘরানা, শিষ্যপরম্পরা আর সঙ্গীত দর্শন আজও বয়ে চলেছে অনন্তকালের পথে। মাইহারে তার বাড়িটি সংস্কার করেছেন অম্বিকা বেড়ি, এক উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে। সেখানে আজও সঙ্গীত পিপাসুরা ছুটে যান, যেন সেই মাটির গন্ধে খুঁজে পান উস্তাদজির অমর উপস্থিতি। উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি—মানুষ থেকে অমরত্বে উত্তীর্ণ হওয়ার বিরল দৃষ্টান্ত। তার জীবন আমাদের শেখায়, প্রকৃত সাধনা কখনো থামে না; সুরের নদী চিরপ্রবাহমান। যে মানুষটি বলেছিলেন ‘সঙ্গীত আমার জাতি আর সুর আমার গোত্র’, তার কাছে সঙ্গীত ছিল নিছক বিদ্যা নয়, ছিল প্রাণের আরাধনা, সত্তার পরিচয়। আজও যখন সরোদের তারে ‘দারা দারা’ ঝংকার ওঠে, মনে হয়, সেই সুরের ভেতর দিয়েই যেন হেসে ওঠেন স্বয়ং উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ—যিনি সুরকে করেছিলেন জীবনের পরম ধর্ম।












