সিপিডির পর্যালোচনা
বাণিজ্য ঘাটতি ১০.৪ বিলিয়ন ডলার, মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ হবে ৫৫১৩০ টাকা

সিপিডির ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’। ছবি: সিপিডির ওয়েবসাইট
দীর্ঘায়িত হওয়ার মুখে পড়েছে দেশের অর্থনৈতিক ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া। অর্জিত স্থিতিশীলতা অত্যন্ত ভঙ্গুর রূপ নেওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য ঘাটতি ১০ হাজার ৪০০ মিলিয়ন (১০.৪ বিলিয়ন) ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এমনকি মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ বেড়ে দাঁড়াবে ৫৫ হাজার ১৩০ টাকা। মূলত একাধিক কাঠামোগত দুর্বলতা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে আটকে রাখছে। এমন চিত্র উঠে এসেছে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) পর্যালোচনায়।
আজ সোমবার সিপিডি আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ডায়ালগে এসব আশঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরা হয়। সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তার উপস্থাপনায় সরকারের প্রথম ছয় মাসের পারফরম্যান্স দুটি প্রধান প্রত্যাশার নিরিখে মূল্যায়ন করা হয়। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রেখে উচ্চ প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনীতির মোড় ঘোরানো। দ্বিতীয়ত, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করা।
ব্যাংক ঋণের হার ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দেশে জনপ্রতি বৈদেশিক ঋণ ১৪.৫ শতাংশ বেড়ে ৪৮ হাজার ১৬৬ টাকা থেকে ৫৫ হাজার ১৩০ টাকায় পৌঁছাবে
বিশ্লেষণ তুলে ধরে ড. দেবপ্রিয় বলেন, বর্তমান সরকার এমন একটি অর্থনীতি পেয়েছে যার ব্যাংক খাত অত্যন্ত ভঙ্গুর, রাজস্ব আদায় দুর্বল, রাজস্ব ঘাটতি প্রবল এবং বিনিয়োগ মন্দাগ্রস্ত। এর সঙ্গে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিবেশ। তবে স্পষ্ট কোনো অর্থনৈতিক ভিত্তি ও সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচির অনুপস্থিতির কারণে অগ্রগতির সঠিক মূল্যায়ন এবং পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সিপিডি সুশাসন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য, ব্যাংকিং, জ্বালানি ও পরিবহন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা— এই ৯টি খাতে সরকারের ৩৬২টি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ পর্যালোচনা করেছে। শুধু ঘোষণা বা প্রতিশ্রুতি নয়, বরং যেসব পদক্ষেপ বাস্তবে বাস্তবায়িত হয়েছে সেগুলোর ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের এই স্কোরকার্ডে মিশ্র চিত্র এলেও ইতিবাচক অর্জনের চেয়ে নেতিবাচক প্রবণতার পাল্লাই ভারী। মূল্যায়িত সূচকগুলোর মধ্যে ১২টিতে উন্নতি হলেও ১৯টিতে অবনতি ঘটেছে। তবে মূল্যস্ফীতিতে কিছু স্বস্তি দেখা গেছে। সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ৯.১ শতাংশ থেকে কমে জুলাইয়ে ৮.৩ শতাংশে নেমেছে, আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৩ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭.২ শতাংশে। তা সত্ত্বেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো চড়া। প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার ঋণাত্মক রয়ে গেছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনের সূচকগুলোতে বড় ধরনের দুর্বলতা স্পষ্ট।
সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে ৬১ হাজার ৮৮১ জন সরাসরি কাজ হারিয়েছেন। সামগ্রিক শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমে এসেছে। পাশাপাশি উৎপাদনমুখী খাতের প্রবৃদ্ধি নেমেছে শূন্যের কোঠায়।
সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ৯.১ শতাংশ থেকে কমে জুলাইয়ে ৮.৩ শতাংশে নেমেছে, আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৩ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭.২ শতাংশে। তা সত্ত্বেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো চড়া
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। নিট এফডিআই প্রবাহ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। ক্যাপিটাল মেশিনারিজ বা মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলা ১৪.৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক (১৩.৬ শতাংশ) হারে দাঁড়িয়েছে, যা ভবিষ্যতে বিনিয়োগ মন্দার ইঙ্গিত।
বাণিজ্য ঘাটতি ৬.৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০.৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চলতি হিসাবের ভারসাম্য ১.৩ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত থাকার বদলে ০.৬ বিলিয়ন ডলার ঘাটতিতে (ঋণাত্মক) চলে গেছে। প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধির হার ২১.৪ শতাংশ থেকে কমে ১১.৮ শতাংশে নেমেছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে গড় মাসিক বৈদেশিক কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫-এ নেমে এসেছে।
এনবিআর রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২.৩ শতাংশ থেকে কমে ৪.৯ শতাংশে নেমে এসেছে। সরকারের বার্ষিক লক্ষ্যের বিপরীতে ব্যাংক ঋণের হার ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দেশে জনপ্রতি বৈদেশিক ঋণ ১৪.৫ শতাংশ বেড়ে ৪৮ হাজার ১৬৬ টাকা থেকে ৫৫ হাজার ১৩০ টাকায় পৌঁছাবে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজের অভাব, দুর্বল রাজস্ব কাঠামো, বৈশ্বিক ধাক্কা, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা মানিয়ে নিতে না পারা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অব্যাহত দুশ্চিন্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতির কারণে অর্থনৈতিক গতিশীলতা ব্যাহত হচ্ছে। ড. দেবপ্রিয় জোর দিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে আর এক বছরের মতো স্বল্পমেয়াদে দেখার সুযোগ নেই।
এই দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয় সামলাতে সিপিডি অক্টোবরের ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও রিয়েল-টাইম তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ‘কোর বাজেট’ প্রণয়ন এবং রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সংস্কারের সময়সীমা মেলানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকিং, রাজস্ব প্রশাসন, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরকারি ব্যয়, এডিপি বাস্তবায়ন, লজিস্টিকস ও ডিজিটালাইজেশনকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে সরকারের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বৃদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে নিয়মিত সংসদীয় তদারকির ওপর জোর দেওয়া হয়।
আলোচনায় জোর দিয়ে বলা হয়, কর্মসংস্থান নীতিতে শুধু কতগুলো চাকরি তৈরি হলো তা দেখলেই চলবে না, চাকরির মান উন্নত করতে হবে। আর শোভন কর্মসংস্থানের মূল চালিকাশক্তি হতে হবে শিল্পায়ন। জ্বালানি খাতে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো, অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান জোরদার, নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার এবং স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি চাহিদা মেটাতে সমন্বিত কৌশল প্রণয়নের ওপরেও জোর দেওয়া হয়।
আলোচকদের মতে, কঠিন সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক সাহসিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটালে বিদ্যমান সংকট আরও জটিল হবে। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় রাজনীতিকরণ করা হলে তা খোদ অর্থনৈতিক সংস্কারকেই ব্যর্থ করে দিতে পারে। তাই টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের ধরন, সমন্বয় ও জবাবদিহির জায়গায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনা জরুরি।







