এইচআরএফবি’র বিবৃতি
এক বাহিনীর বদলে অন্য বাহিনী নয়, গুমের তদন্তে চাই স্বাধীন কর্তৃপক্ষ
- ‘অভিযুক্তের বাইরে’ তদন্ত না হলে সত্য উদঘাটন কঠিন
- ধারা ১৪ পুনর্বিবেচনার দাবি

সংগৃহীত ছবি
গুমের অভিযোগের তদন্তে অভিযুক্ত কোনো বাহিনীর বদলে অন্য কোনো বাহিনীকে দায়িত্ব দিলেই তদন্ত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হয় না বলে মন্তব্য করেছে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি)। সংগঠনটি বলেছে, গুমের ঘটনায় সত্য উদঘাটন, দায় নির্ধারণ, বিচার এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে অভিযুক্ত ব্যক্তি, বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করতে হবে। এ জন্য ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এর ধারা ১৪ পুনর্বিবেচনারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
শনিবার এক সংবাদ বিবৃতিতে এইচআরএফবি জানায়, জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এ গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে তদন্তব্যবস্থা স্বাধীন না হলে আইনে যত কঠোর শাস্তি ও প্রতিকারের বিধানই রাখা হোক না কেন, তা বাস্তবায়নে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
বিলটির ধারা ১৪(৩)-এ কোনো শৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে তদন্ত থেকে বিরত রাখার বিধানকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে এইচআরএফবি। তবে একই ধারায় অভিযুক্ত বাহিনীর পরিবর্তে অন্য কোনো শৃঙ্খলা-বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে তদন্তভার দেওয়ার সুযোগ রাখায় আপত্তি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এইচআরএফবির ভাষ্য, একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্তের দায়িত্ব অন্য একটি বাহিনীকে দিলেই তদন্ত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হয়ে যায় না। কারণ গুমের অভিযোগের তদন্তে শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তির ভূমিকা নয়, পুরো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ বা সম্পৃক্ততার বিষয়ও খতিয়ে দেখতে হতে পারে।
সংগঠনটি জানায়, আটক বা হেফাজতের নথি, ডিউটি রোস্টার, যানবাহনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও কল রেকর্ডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলামত তদন্তের আওতায় আসতে পারে। একই সঙ্গে কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নির্দেশ দিয়েছেন কি না বা ঘটনার সঙ্গে কোনো পর্যায়ে কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তাও অনুসন্ধান করতে হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান যদি কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রভাবাধীন থাকে, তাহলে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা থাকে বলে মনে করছে এইচআরএফবি।
এ ক্ষেত্রে ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩’-এর অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংগঠনটি। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে নির্যাতন কিংবা হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগের তদন্তের প্রাথমিক দায়িত্ব পুলিশের ওপর থাকায় তদন্তের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে প্রশ্ন।
এইচআরএফবি বলছে, একই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীন কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত করানো হলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। এতে তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। ফলে আইন থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন ভুক্তভোগীরা।
এই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি এড়াতে গুমের অভিযোগ তদন্তে একটি স্বাধীন ও বিশেষায়িত তদন্ত কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে এইচআরএফবি। সংগঠনটির মতে, তদন্তের প্রয়োজনে পুলিশ বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারিগরি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। তবে তদন্তের নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ স্বাধীন কর্তৃপক্ষের হাতে থাকতে হবে।
জাতীয় সংসদে বিলটি পাসের আগে ধারা ১৪সহ তদন্তসংক্রান্ত বিধানগুলো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে এইচআরএফবি। একই সঙ্গে অতীতে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলোকেও প্রস্তাবিত স্বাধীন তদন্তব্যবস্থার আওতায় এনে সত্য উদঘাটন, দায় নির্ধারণ, বিচার এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।








