রাজধানীর তিন হাসপাতালে র্যাবের অভিযান
রোগী জিম্মি করে ক্লিনিকে ভাগিয়ে নিত দালাল চক্র, ১২ জনের দণ্ড

সংগৃহীত ছবি
সরকারি হাসপাতালের অলিগলি যেন তাদেরই দখলে। টার্গেট একটাই, চিকিৎসার আশায় আসা অসহায় রোগী ও তাদের স্বজন। কখনো মিষ্টি কথায়, কখনো ভুয়া আশ্বাসে, আবার কখনো ভয়ভীতি বা জিম্মি করে তারা রোগীদের সরকারি হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেয় বেসরকারি ক্লিনিকে। বিনিময়ে দালাল চক্রের পকেটে যায় মোটা অঙ্কের কমিশন। আর চিকিৎসার অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে গিয়ে সর্বস্ব হারানোর উপক্রম হয় অনেক পরিবারের। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান, গ্রেপ্তার ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমের পরও থামছে না এই দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য। দিনের পর দিন সরকারি হাসপাতাল চত্বরে প্রকাশ্যেই সক্রিয় তারা। ফলে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীরা যেমন প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, তেমনি প্রশ্নের মুখে পড়ছে সরকারি হাসপাতালের নিরাপত্তা ও তদারকি ব্যবস্থাও।
সোমবার রাজধানীর শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) একযোগে অভিযান চালিয়ে দালাল চক্রের নারীসহ ১২ সদস্যকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। আদালত পরিচালনা করেন র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজী তামজীদ আহমেদ। অভিযানে অংশ নেন র্যাব-২ এর সদস্যরা। সকাল ৯টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত এ অভিযান চালায় র্যাব। এ সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও উপস্থিত ছিলেন।
র্যাব জানায়, চক্রটি বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল থেকে চিকিৎসার জন্য আসা সহজ-সরল রোগী ও তাদের স্বজনদের টার্গেট করত। সরকারি হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা পাওয়া যাবে না— এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে তারা রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যেত। এর মাধ্যমে তারা কমিশনভিত্তিক মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করত।
র্যাবের ভাষ্য, এ ধরনের প্রতারণার কারণে রোগীরা যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের বা অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিয়ে অপচিকিৎসারও শিকার হচ্ছেন।
ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-২ উপ-অধিনায়ক নিফাজ রহমান বলেছেন, আমরা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পেরেছি এখানে একটি অসাধু দালাল চক্রের কারণে সাধারণ রোগীদের বিভিন্ন ভোগান্তি পোহাতে হয়। আজকে আমাদের অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হলো দালাল চক্র চিহ্নিতকরণ ও গ্রেপ্তার, তাৎক্ষণিক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ ও রোগীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। সোহরাওয়ার্দী, পঙ্গু ও হৃদরোগ হাসপাতালে অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানে নারীসহ ১২ দালাল আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান তিনি।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা বলেছেন, চলমান দালালবিরোধী অভিযানে হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হয়। মাঝেমধ্যেই র্যাবের অভিযানের কারণে আমাদের কাজটা অনেক সহজ হয়। চিহ্নিত দালাল ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার বিষয় জানতে চাইলে তিনি বললেন, সরকারি হাসপাতালের কোনো কর্মচারী জড়িত থাকার প্রমাণ পাইনি। এর আগে আউট সোর্সিংয়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজী তামজীদ আহমেদ জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীদের বিভিন্ন কৌশলে ভুল বুঝিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে আসছিলেন।




