খুনের বদলা খুন
রাজধানীর নিউমার্কেটে ফিল্মি স্টাইলে গুলি
- সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই টিপু হত্যার প্রতিশোধ নিতে খুন করা হয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটনকে

সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর ব্যস্ততম নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে ফিল্মি স্টাইলে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটনকে (৫৫)। নিহত টিটন আরেক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সম্বন্ধী। মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর ঘটেছে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে নাড়া দেওয়া এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। তাৎক্ষণিকভাবে গা হিম করা এই খুনের কোনো ক্লু খুঁজে পায়নি পুলিশ। তবে অপরাধ জগতের একাধিক সূত্র বলছে, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যার বদলা নিতেই পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে এই হত্যাকাণ্ড।
কিলিং মিশন চালাতে মাস ানেক আগে দুবাই থেকে ঢাকায় আসে মোহাম্মদপুরের বাদল ওরফে কিলার বাদল। দুবাই বসে এই খুনের পরিকল্পনা করেন সাবেক সেনাপ্রধানের ভাই পুরস্কার ঘোষিত আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ আহমেদ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, সবে সন্ধ্যা পেরিয়ে নেমেছে আধার। তবে স্ট্রিটলাইটের আলোতে তখনো আলোকিত রাজধানীর নিউমার্কেটের পাশের বটতলা এলাকা। সেখান দিয়েই দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন। ঠিক তখনই তাকে লক্ষ্য করে দুই রাউন্ড গুলি করে মোটরবাইকে আসা ঘাতক চক্রের সদস্য, যিনি দুই হাতে অস্ত্র চালাতে পারদর্শী। এরপর দৌড়ে কাছে গিয়ে আরও দুই রাউন্ড গুলি করে মুখে মাস্ক পরা অস্ত্রধারী। ঘাতকের তপ্ত বুলেটের আঘাতে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন টিটন। তখন তার মৃত্যু নিশ্চিতে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে আরেক দফা গুলি করে ঘাতক। পরে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায় তারা। গুলিবিদ্ধ টিটনের নিথর দেহ উদ্ধার করে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। রাত সাড়ে আটটার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেছেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।
খুনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী রতন নামে এক কিশোর জানিয়েছে, চোখের নিমিষেই ঘটে যায় পুরো ঘটনা। হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে যেতে ঘাতকরা সময় নিয়েছে মাত্র ১ মিনিট। এমনকি ঘটনার সময় লোকজন চিৎকার দিলে, পালানোর আগে এক রাউন্ড ফাঁকা গুলিও ছোঁড়ে তারা। পরে দৌড়ে গিয়ে একটি মোটরসাইকেলের পেছনে ওঠে ঘাতক। মোটরসাইকেলটি চলে যায় বিজিবি গেটের দিকে। আশপাশের লোকজনের সহায়তায় টিটনকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে।
টিটনের হাতে, গায়ে ও মাথায় বেশ কয়েকটি গুলির চিহ্ন রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ি উপ-পরিদর্শক মো. ফারুক।
অপরাধ জগতের একাধিক সূত্র জানাচ্ছে, ২০০৫ সালে ঢাকার অপরাধ জগতের যে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে সরকার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল সেই তালিকায় উপরের দিকেই রয়েছে টিটনের নাম। ১৯৯৯ সালে বিমানবন্দর সড়কের নিকুঞ্জ এলাকায় খুন হয়েছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু। চলন্ত গাড়িতে ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল তাকে। এতে সরাসরি জড়িত ছিলেন টিটন। এই হত্যা মামলায় দীর্ঘদিন সাজাও হয়েছিল তার। সাজাভোগের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে কারাগার থেকে বের হন তিনি। কারামুক্ত হন তার বোনজামাই আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনও। ইমন দেশের বাইরে চলে গেলেও টিটন ছিলেন দেশেই।
আরেকটি সূত্র জানায়, টিটন কারামুক্ত হওয়ার পর থেকেই তাকে টার্গেট করেন শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ আহমেদ। ভাইয়ের খুনের বদলা নিতে দুবাই বসেই টিটন হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। ছক মাফিক মাস খানেক আগে জোসেফের সহযোগী ও তার কিলার বাহিনীর অন্যতম সদস্য বাদল ওরফে কিলার বাদলকে দুবাই থেকে পাঠানো হয় দেশে। ফিরেই ‘কামলা’ দিয়ে টিটনের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে থাকেন তিনি।
সেনাপ্রধানের চাকরি শেষ হওয়ার পর তার ভাই যোসেফ দুবাই গেলে মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা কিলার বাদলও পাড়ি জমান সেই দেশে। মূলত এই হত্যর ছক করেই দেশে পাঠানো হয় বাদলকে। তার তত্ত্বাবধানেই এই কিলিং মিশন চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে, নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মো. আইয়ুব বলছেন, ‘নিউমার্কেটের পাশে বটতলা এলাকায় একজনকে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। ঘটনাস্থলে গিয়ে অনেক রক্ত দেখেছি। গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে জানা যায় নিহত ব্যক্তি শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন।’
তবে এই হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সম্পর্কে কিছু বলতে পারেননি তিনি।




