বিশ্বকাপ টিকিট
কাউন্টার থেকে মোবাইল অ্যাপে

লাইন ধরে বিশ্বকাপ ম্যাচের টিকিট কাটার দিন আর নেই। সেখানে ঢুকে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ স্মার্ট সব প্রযুক্তি। লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
স্টেডিয়ামভর্তি হাজারো মানুষের গগনবিদারী চিৎকার, প্রিয় দলের জার্সি গায়ে উন্মাদনা আর মাঠের সবুজ ঘাসে বিশ্বসেরাদের পায়ের জাদু— ফুটবল বিশ্বকাপের এই রোমাঞ্চ ছুঁয়ে দেখতে দর্শককে প্রথম যে বাধাটি পার হতে হয়, তা হলো একটি ‘টিকিট’। আর সেখানেই ছিল একদিকে কালোবাজারির উপদ্রব, অন্যদিকে দর্শকের চাপে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা। তবে গত তিন দশকে এই টিকিটের রূপ বদলেছে রূপকথার মতো।
১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপ ফুটবল ছিল টিকেটিং প্রযুক্তির আধুনিকায়নের একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট। সে বছরই প্রথম টিকিটে উন্নত বারকোড সিস্টেম এবং বিশেষ সিকিউরিটি ওয়াটারমার্কের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। কম্পিউটারাইজড টিকেটিং ব্যবস্থার প্রাথমিক ছোঁয়া লেগেছিল এ আসরেই। এর ফলে কাউন্টারে ম্যানুয়ালি টিকিট পরীক্ষা করার ঝামেলা যেমন কমে, তেমনি জাল টিকিট চিহ্নিত করাও সহজ হয়ে ওঠে।
এর ঠিক চার বছর পর ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে টিকেটিং ব্যবস্থায় আরও বড় পরিবর্তন আসে। এই বিশ্বকাপে প্রথমবার টিকিট বিক্রির প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয় ইন্টারনেট। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে সে বছর লটারি বা সাধারণ বুকিংয়ের জন্য ওয়েবসাইটের প্রাথমিক ব্যবহার শুরু হয়। টিকিটের মূল কাগজে যুক্ত করা হয় হলোগ্রাফিক ফ্ল্যাশ, যা সাধারণ ফটোকপি মেশিন দিয়ে নকল করা অসম্ভব ছিল।
২০০২ সালের দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে প্রথম যৌথ আয়োজন হিসেবে যেমন অনন্য ছিল, তেমনি টিকেটিং প্রযুক্তিতেও এটি একটি নতুন যুগের সূচনা করে। এই বিশ্বকাপে ফিফা প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক টিকিট বিক্রয় ব্যবস্থা চালু করে। কাগজের টিকিটের ভেতরে এক ধরনের বিশেষ থার্মাল কালার চেঞ্জিং ইংক ব্যবহার করা শুরু হয়, যা মানুষের হাতের স্পর্শে বা তাপে রঙ পরিবর্তন করত। এটি ছিল জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক দারুণ প্রতিরোধ।
২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে টিকিটের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক স্পর্শ করে। এই বিশ্বকাপে প্রথমবার টিকিটের ভেতরে ব্যবহার করা হয় আরএফআইডি মাইক্রোচিপ প্রযুক্তি। প্রতিটি টিকিটের ভেতরে একটি অদৃশ্য চিপ বসানো ছিল, যা স্টেডিয়ামের গেটে থাকা সেন্সরের কাছাকাছি আসতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিকিটের বৈধতা ও মালিকের তথ্য যাচাই করে নিত। এই আরএফআইডি প্রযুক্তির কারণে স্টেডিয়ামে প্রবেশের লাইনে অপেক্ষার সময় নাটকীয়ভাবে কমে যায় এবং কালোবাজারি পুরোপুরি থমকে দাঁড়ায়।
২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে এই প্রযুক্তির আরও পরিমার্জিত রূপ দেখা যায়। আফ্রিকা মহাদেশের প্রথম এই বিশ্বকাপে আরএফআইডি চিপের পাশাপাশি টিকিটে উন্নত টু-ডি বারকোড বা কিউআর কোডের মতো প্রাথমিক প্রযুক্তির মেলবন্ধ ঘটানো হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক দর্শকের জন্য টিকিটের তথ্য মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হয়, যা ডিজিটাল টিকেটিংয়ের পথকে আরও সুগম করে।
এর পরে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে টিকিটের কাগজ তৈরিতে উচ্চ প্রযুক্তির নিরাপত্তা সুতা এবং আলট্রাভায়োলেট আলোতে দৃশ্যমান কালির ব্যবহার বাড়ানো হয়। আরএফআইডি চিপের ধারণক্ষমতা ও প্রসেসিং গতি আরও উন্নত করা হয়েছিল এই আসরে, যার ফলে টার্নস্টাইল গেটগুলো আরও বেশি দর্শক ধারণ করতে পারত।
রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে টিকেটিংয়ের ধারণাটি কেবল খেলা দেখার কাগজের টুকরো থেকে বেরিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচয়পত্রে রূপ নেয়। এ আসরে ফিফা চালু করে ‘ফ্যান আইডি’ প্রযুক্তি। এটি ছিল একটি চিপযুক্ত প্লাস্টিক কার্ড, যা টিকিটের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করত। এই ফ্যান আইডি একদিকে যেমন স্টেডিয়ামে প্রবেশের টিকিট হিসেবে কাজ করত, অন্যদিকে এটি রাশিয়ার জন্য বিনা ভিসায় প্রবেশাধিকার এবং ম্যাচের দিনগুলোতে বিনামূল্যে গণপরিবহন ব্যবহারের পাস হিসেবেও কাজ করেছিল। বায়োমেট্রিক ডেটা ও টিকেটিংয়ের এই সমন্বয় ছিল প্রযুক্তির এক অসাধারণ নজির।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলবিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দেয় সম্পূর্ণ কাগজহীন টিকেটিং ব্যবস্থার সঙ্গে। এ আসরেই প্রথম প্রথাগত কাগজের টিকিটকে প্রায় পুরোপুরি বিদায় জানিয়ে চালু করা হয় অফিসিয়াল ‘ফিফা টিকেটিং অ্যাপ’। ব্লকচেইন ও ক্রিপ্টোগ্রাফিক কিউআর কোড প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি এই ডিজিটাল টিকিটগুলো ছিল সম্পূর্ণ ডায়নামিক।
অর্থাৎ, স্ক্রিনশট নিয়ে এই টিকিট কেউ নকল করতে পারত না, কারণ কয়েক সেকেন্ড পরপর অ্যাপের কিউআর কোডটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলে যেত। টিকিট একজনের অ্যাকাউন্ট থেকে অন্যজনের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করার পুরো প্রক্রিয়াটিও নিরাপদ করা হয়েছিল এই ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে।
বর্তমানে চলমান ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) বিশ্বকাপে টিকেটিং প্রযুক্তি পৌঁছে গেছে তার চূড়ান্ত শিখরে। এবার ৪৮টি দলের ১০৪টি ম্যাচের বিশাল কর্মযজ্ঞ সামলাতে শতভাগ ডিজিটাল টিকেটিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।
কাতার বিশ্বকাপের ডায়নামিক কিউআর কোড প্রযুক্তির সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে উন্নত এআইচালিত ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট এবং মোবাইল ওয়ালেট ইন্টিগ্রেশন। অ্যাপল ওয়ালেট বা গুগল পে-র মতো এনএফসি প্রযুক্তির মাধ্যমে দর্শক এখন শুধু তাদের ফোন বা স্মার্টওয়াচ টার্নস্টাইলে স্পর্শ করেই স্টেডিয়ামে প্রবেশ করছেন।




