তরুণদের লিভারের যত্ন

কিছুদিন আগে কারিনা কায়সারের মৃত্যু লিভারের যত্নে উদাসীনতার বিষয়টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম আগের চেয়ে অনেক বেশি ফাস্টফুডনির্ভর, কায়িক পরিশ্রমবিমুখ এবং ডিভাইসমুখী। শুনতে যতটা কঠোর শোনাচ্ছে, স্বাস্থ্যগত দিক থেকে ভয়াবহতার মাত্রা এর চেয়েও অনেক বেশি। এ কারণে আগের চেয়ে অনেক বেশি তরুণ ফ্যাটি লিভার গ্রেড-১ ও ২-এ আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি তিনজনের একজন ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হচ্ছেন। জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি শরীরচর্চা কমে যাওয়া এ সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এ ছাড়া বিশ্ব জুড়ে বাড়তে থাকা ডায়াবেটিস ও থাইরয়েডের সমস্যার কারণে বর্তমানে ফ্যাটি লিভারকে উপেক্ষা করা কঠিন।
যে কারণে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা দেখা দেয়—
- উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস থাকলে।
- থাইরয়েড সমস্যা, নারীদের ক্ষেত্রে পিসিওএস বা অন্যান্য মেটাবলিক সমস্যা থাকলে।
- জন্মগত ওজন বৃদ্ধিজনিত সমস্যা থাকলে।
- রক্তে অতিরিক্ত চর্বি, বিশেষত ক্ষতিকর ট্রাইগ্লিসারাইড বা খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল) থাকলে।
- হেপাটাইটিস এ ও বি, বিশেষত হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত হলে।
- অতিরিক্ত অ্যালকোহল পানের অভ্যাস থাকলে।
- শরীরচর্চা বা কায়িক পরিশ্রম কম করলে।
- অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, যেমন— অতিরিক্ত ভাত এবং ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি ঝোঁক থাকলে।
- অতিরিক্ত কোমল পানীয় পান করলে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা
কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে লিভারের কার্যকারিতা ও ফ্যাটি লিভারের গ্রেড শনাক্ত করা যায়। লিভারের যত্নে প্রতিবছর অন্তত একবার এই পরীক্ষাগুলো করা দরকার—
- লিভার এনজাইমের এএলটি পরীক্ষা।
- ফাস্টিং লিপিড প্রোফাইল।
- থাইরয়েড পরীক্ষা– টিএসএইচ, টিথ্রি ও টিফোর।
- হোল এবডোমেন আলট্রাসাউন্ড।
- ডায়াবেটিস আছে কিনা জানতে ফাস্টিং গ্লুকোজ ও খাবারের ২ ঘণ্টা পর গ্লুকোজ পরীক্ষা।
- হেপাটাইটিস বি ও সি পরীক্ষা।
সমস্যা রোধে যা করতে হবে
ফ্যাটি অ্যাসিড মূলত লাইফস্টাইলের কারণে উদ্ভূত সমস্যা। ফলে এ সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে লাইফস্টাইল মডিফিকেশনের বিকল্প নেই। খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের ধরনের বদল এটি প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট। পাশাপাশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ফ্যাটি লিভারের গ্রেড নির্ণয় করে নানা ধরনের ওষুধও দেওয়া হয়।
ফ্যাটি লিভার সমস্যায় নিয়মিত শরীরচর্চা, সাইক্লিং, সাঁতার, অন্তত আধাঘণ্টা দ্রুতগতিতে হাঁটাসহ কায়িক পরিশ্রমের বিকল্প নেই। হাঁটার ক্ষেত্রে প্রতি সেকেন্ডে দুই কদম করে এমন গতিতে হাঁটতে হবে, যাতে ঘাম ঝরে।
রোগীদের একবেলা ভাত ও দুইবেলা রুটি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। রেড মিট, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার বাদ দিতে হবে।
ফ্যাটি লিভার সমস্যায় ওজন কমানোর ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। বিএমআই অনুযায়ী অতিরিক্ত ওজন থাকলে পুষ্টিবিদের পরামর্শে উপযুক্ত ডায়েট চার্ট তৈরি করে সে অনুযায়ী খেতে হয়।
স্লিপ সাইকেল ঠিক রাখতে হবে। ঘুমানোর অন্তত দুই ঘণ্টা আগে খেতে হবে। খাওয়ার পর অন্তত ১৫-২০ মিনিট কম গতিতে হাঁটতে হবে। এতে খাবার হজমে সুবিধা হয়, হুট করে রক্তে গ্লুকোজ লেভেলও বেড়ে যেতে পারবে না।
বাড়তি সতর্কতা
বয়স্কদের আর্থ্রাইটিসের সমস্যা থাকলে কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে ফ্যাটি লিভার সমস্যা মোকাবিলা করা কঠিন। সে ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসে বেশি জোর দিতে হবে। পুষ্টিবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে ডায়েট চার্ট মেনে চলতে হবে।
লেখক: ইনডোর মেডিকেল অফিসার (ইন্টারনাল মেডিসিন), রেসিডেন্ট হেপাটোলজি, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়




