প্রবীণদের জন্য প্যালিয়েটিভ কেয়ার

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
১৫ জুন ছিল ‘বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস’। বয়স্কদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অবহেলা, আর্থিক শোষণ রোধ এবং তাদের মানবাধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় জনসচেতনতা সৃষ্টিতে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী এ দিবসটি পালিত হয়। এ দিবস ঘিরে অনুচ্চারিত অনেক কথা বলার সুযোগ মেলে। এমনই একটি বিষয়ের নাম প্যালিয়েটিভ কেয়ার। এটি নিয়ে কথা হয় প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটি অব বাংলাদেশের মুখপাত্র ও সাইকোথেরাপিস্ট অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়ার সঙ্গে। অনুলিখনে মুমিতুল মিম্মা
প্যালিয়েটিভ কেয়ার কী
প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থা যখন আর কাজে আসে না, তখন নিরাময় অযোগ্য রোগীদের জন্য কাজ করে প্যালিয়েটিভ কেয়ার। এদের কারও হয়তো ফুসফুসের ক্যানসার, কারও কিডনি অকেজো হয়ে পড়েছে এবং কেউ ভুগছেন ডিমেনশিয়ায়। এই মানুষগুলোর সুস্থতায় কাজ করে প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিট।
প্যালিয়েটিভ কেয়ারের বিভিন্ন সংজ্ঞা রয়েছে। সেখানে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি নতুন যুক্ত হয়েছে আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য। এই চারটি ডাইমেনশনেই কাজ করে প্যালিয়েটিভ কেয়ার। পরিবার বোঝে না কীভাবে যত্ন করবে, রোগী বুঝে উঠতে পারেন না কী করবেন। এক অনন্ত না বোঝাবুঝির মধ্যের এ যাত্রাকে সহজ করে তোলে প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিট।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবী জুড়ে মাত্র ১২-১৪ শতাংশ মানুষ এ সেবায় অন্তর্ভুক্ত হন। আর সেখানে বাংলাদেশের মতো একেবারেই নিম্ন আয়ের দেশে এ সেবা পেতে হলে অবশ্যই ঢাকামুখী হতে হয়।
ঘনবসতিপূর্ণ এ দেশে মানুষের সাধারণ চিকিৎসাই যেখানে দুঃসাধ্য, সেখানে প্রবীণদের মতো নাজুক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষায়িত এ সেবার জন্য রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সংকটের বিষয়টি সহজেই অনুমেয়।
প্যালিয়েটিভ কেয়ারের কাজ
বিশেষায়িত এ বিভাগটি ক্যানসার, কিডনি বা হৃদরোগের মতো গুরুতর বা নিরাময় অযোগ্য রোগীদের শারীরিক ব্যথা এবং মানসিক চাপ লাঘবে বিশেষ সেবা দিয়ে থাকে। এর মূল লক্ষ্য রোগ সারানো নয়, বরং রোগীকে একটি আরামদায়ক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন দেওয়া।
প্যালিয়েটিভ কেয়ারের প্রধান কাজ—
- রোগের কারণে সৃষ্ট তীব্র ব্যথা, বমি বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি এবং ঘুমের সমস্যা দূর করা।
- গুরুতর অসুস্থতার ফলে সৃষ্ট দুশ্চিন্তা, হতাশা ও ভয় কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করা।
- রোগীর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের মানসিক শান্তি ও বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠতে সহযোগিতা করা।
- রোগীরা যেন জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারেন, তা নিশ্চিত করা।
- রোগীর দৈনন্দিন কাজ সহজ করা এবং আধ্যাত্মিক বা সামাজিক শান্তি প্রদানে সহায়তা করা।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্যালিয়েটিভ কেয়ারের সংকট
নিরাময় অযোগ্য মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের জন্য সবচেয়ে দরকারি জিনিস হলো ব্যথানাশক। একে তো মরফিনের উৎপাদন কম, আবার ঢাকায় ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থানে ওষুধটি পাওয়াও যায় না ঠিকমতো। ফলে শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সংকটের সঙ্গে এখানে যুক্ত হয় প্রাতিষ্ঠানিক সংকট।
বেশ কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে প্যালিয়েটিভ ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, হসপিস বাংলাদেশ, ডেলটা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ইউনাইটেড হাসপাতাল, সিটি হাসপাতালসহ কিছু এনজিও ও প্রবীণ নিবাসে এ সুবিধা পাওয়া যায়
পরিবারে সংকট
নিরাময় অযোগ্য রোগে ভোগার সময় পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে তৈরি হয় বিস্তর দূরত্ব। অনেক ক্ষেত্রে নিজেকে বোঝা হিসেবে আবিষ্কার করেন তিনি। ফলে কেয়ার গিভার ও পরিবারের লোকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংকটের মাত্রা আরও বাড়ে, যদি রোগী পুরুষ না হয়ে নারী হন। পুরুষ ঘরের কর্তা ছিলেন বলে যদিওবা সুচিকিৎসা পান, নারীর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল। একপর্যায়ে আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত হয়ে চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় অনেক পরিবার। ফলে মৃত্যুর অনেক আগেই রোগী বারবার মারা যেতে বাধ্য হন। নির্যাতনের নানা রঙ ও রূপ দেখে জীবনের শেষভাগটি হয় আনন্দহীন। এসব রোগী যখন মারা যান, তখন ছেলেমেয়েদের কান্নাকাটির কতটুকু রিলিফের আর কতটুকু অপরাধবোধের— সেটুকুও আলাদা করা যায় না।
পরস্পরের দিকে আন্তরিক হাতটি বাড়িয়ে দিন
নিরাময়যোগ্য নয়, এমন রোগ নিয়ে কাজ করতে গেলে নির্যাতন শব্দটি থাকে উহ্য। আমাদের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক নানা অক্ষমতা আমাদের নির্যাতন করে এবং এর শিকার বানায়। বিশ্ব জুড়ে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের এখন দুটো মডেল খুব জনপ্রিয়। কমিউনিটি বেজড মডেল ও অন্যটি ইনস্টিটিউশন বেজড মডেল।
কমিউনিটি বেইজড প্যালিয়েটিভ কেয়ার মডেলে রোগীর নিজস্ব বাড়িতে, স্থানীয় ক্লিনিকে বা কমিউনিটির ভেতরে তাকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। এতে রোগী নিজের পরিচিত পরিবেশে, পরিবারের মধ্য থেকে সেবা পান। এটি একটি সাশ্রয়ী মডেল। এতে সামাজিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি পরস্পরের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক এবং চিকিৎসক বা নার্সদের একটি দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেয়। ভারতের কেরালায় চালু হওয়া ‘নেইবারহুড নেটওয়ার্ক ইন প্যালিয়েটিভ কেয়ার’কে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কমিউনিটি বেইজড মডেল।
আর ইনস্টিটিউশন বেইজড প্যালিয়েটিভ কেয়ার মডেলে রোগীকে নির্দিষ্ট কোনো মেডিকেল প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অপেক্ষাকৃত জটিল রোগীর ক্ষেত্রে এ মডেল ব্যবহার করা হয়। এতে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ও পেশাদার হাসপাতালে তাৎক্ষণিক ২৪ ঘণ্টার মেডিকেল সহায়তা পাওয়া যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও প্যালিয়েটিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞদের মতে, এ দুই মডেলের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, বরং একে অন্যের পরিপূরক। রোগীর অবস্থা ও জটিলতা অনুযায়ী উভয় পদ্ধতির সমন্বয়ে সেবা দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর।
রাষ্ট্রের তরফ থেকে ইনস্টিটিউশন বেজড মডেলকে জোর দেওয়া হলেও আমি-আপনি আমাদের পরিবার ও স্বজনদের খোঁজ এবং যত্নের মাধ্যমে কমিউনিটি বেজড মডেলটি নিজে কাজ করাতে পারি। অন্যদের দিকে সহায়তার হাতখানি বাড়িয়ে দিলে, নিজের বেলায়ও খালি হাতে ফিরতে হবে না— এ আশা করাই যায়!




