বড় হচ্ছে ঢাকা জেলা, ছোট হচ্ছে গাজীপুর ও না.গঞ্জ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আজ যে পূর্বাচল দেশের সবচেয়ে বড় পরিকল্পিত শহর হিসেবে পরিচিত, সেটি মূলত তিন জেলার মধ্যে বিভক্ত। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ— এই তিন জেলার মধ্যে বিভক্ত থাকায় শহরটির প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা, ভূমি রেকর্ড এবং নাগরিক সেবা পরিচালনায় নানা জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছিল। এবার সে সমস্যার স্থায়ী সমাধানে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মোট ১৬টি মৌজা ঢাকা জেলার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
প্রস্তাব অনুযায়ী, পূর্বাচলের প্রায় ৬ হাজার ২১ একর জমি ঢাকা জেলার আওতায় আসবে। একই সঙ্গে দেশের সবচেয়ে বড় পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্পটি সম্পূর্ণভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অধীনে চলে আসবে। এতে ঢাকা জেলার আয়তন বাড়বে, আর কিছুটা ছোট হবে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলা।
প্রস্তাবটি আগামীকাল ১ জুলাই প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। নিকারের সম্মতি মিললে পুরো পূর্বাচল শহর পরিচালনার দায়িত্ব চলে যাবে এককভাবে ঢাকা জেলার হাতে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম গতকাল আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘নিকারের সভায় অনুমোদন পেলে প্রকল্প এলাকাটি ঢাকা উত্তর সিটির আওতায় আনা হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে প্রকল্প এলাকার মানুষের নাগরিক সেবা, নিরাপত্তা ও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবে ঢাকা উত্তর সিটি।’ তবে সরকারের এমন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে নগর পরিকল্পনাবিদদের অনেকে বলছেন, এমনটি করা হলে ঢাকা শহর আরও ‘ভারাক্রান্ত’ হবে। তাই পূর্বাচলের জন্য আলাদা প্রশাসনের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘পূর্বাচলের সিংহভাগই নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলায়। নতুন শহরের জন্য নতুন কর্তৃপক্ষ হতে পারত। তা না করে এটিকে ঢাকা শহরের ভেতরে এনে ঢাকাকে আরও ভারাক্রান্ত করা হচ্ছে। রাজধানীকে আরও বড় করা হচ্ছে। এমনিতেই কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছে না দুই সিটি করপোরেশন। আয়তন বাড়লে বরং সেবার মান আরও কমবে। সরকার প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের কথা বললেও বাস্তবে এর বিপরীতে কাজ করছে।’
বর্তমানে পূর্বাচল প্রকল্পের একটি অংশ ঢাকা জেলার ক্যান্টনমেন্ট ও খিলক্ষেত থানার কয়েকটি মৌজায়, দুটি মৌজা গাজীপুরের কালীগঞ্জে এবং বাকি ১৪টি মৌজা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। ফলে একই শহরের ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন জেলা প্রশাসন, পুলিশ, ভূমি অফিস ও স্থানীয় সরকারের অধীনে সেবা পরিচালিত হওয়ায় নাগরিকদের নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়।
সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এই ১৬টি মৌজা ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত হবে। এরপর পুরো পূর্বাচল নতুন শহর পরিচালিত হবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং ঢাকা ওয়াসার আওতায়। এতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, নাগরিক সেবা এবং অবকাঠামো পরিচালনায় সমন্বয় অনেক সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে কয়েক মাসের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর গত ২৫ মার্চ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পরে ২৩ এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকে পূর্বাচলকে ঢাকা জেলার আওতায় আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এরপর মে মাসে প্রাক-নিকার সচিব কমিটিও প্রস্তাবটি অনুমোদন দেয়। এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।
এর আগে গত ১০ এপ্রিল জারি হওয়া ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৬’-এ রাজউকের কার্যপরিধি নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনের ১(২) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাজউকের আওতা ঢাকা মহানগরী ছাড়াও ঢাকা জেলার সাভার ও কেরানীগঞ্জ এবং নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার নির্ধারিত এলাকা জুড়ে বিস্তৃত থাকবে। নতুন আইনে রাজউকের ভৌগোলিক কার্যপরিধি বহাল থাকলেও প্রশাসনিক সুবিধার জন্য পূর্বাচল প্রকল্পের অংশবিশেষকে ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করার পৃথক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পূর্বাচলকে ঢাকার মধ্যে আনার কারণ জানিয়ে রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী মোহাম্মদ নূর-ই-খোদা বলেছেন, ‘প্রকল্প হস্তান্তরের পরই রাজউকের দায়িত্ব শেষ। সেক্ষেত্রে পূর্বাচল প্রকল্পের রাস্তাঘাট নির্মাণ, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, পানিসহ সেবা-পরিসেবার বিষয়টি দেখভাল করবে কে? এ সবকিছুর সুষ্ঠু সমাধানের জন্যই পুরো প্রকল্পটি ঢাকা জেলার অধীনে আনা হচ্ছে।’
১৯৯৫ সালে রাজউকের নিজস্ব অর্থায়নে শুরু হওয়া পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার ২৬১ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে। এখানে ৩০টি সেক্টরে রয়েছে ২৬ হাজারের বেশি আবাসিক প্লট এবং সাড়ে তিন হাজারের বেশি বাণিজ্যিক, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্লট।
আধুনিক অবকাঠামো গড়ে উঠলেও প্রশাসনিক বিভাজনের কারণে নাগরিক সেবা ও ব্যবস্থাপনায় যে জটিলতা এতদিন ছিল, সরকার আশা করছে এই নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তার অবসান ঘটবে। ফলে পূর্বাচল শুধু পরিকল্পিত শহর হিসেবেই নয়, প্রশাসনিকভাবেও একটি একক ও সমন্বিত নগর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।




