মমতার ফেরা প্রায় অসম্ভব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তৃণমূল কংগ্রেসের যাবতীয় পদ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অপসারিত! আপাত অসম্ভব এই ঘটনা মাত্র কয়েক দিন আগেই ঘটে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে। কলকাতার নিউ টাউনের একটি হোটেলে বৈঠক করে তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন জাতীয় কর্মসমিতি গঠন করেছেন দলটির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি নির্বাচিত বিধায়ক। সেই কর্মসমিতিতে জায়গা হয়নি দলের প্রতিষ্ঠাতা মমতার।
তৃণমূল কংগ্রেস ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতীয় রাজনীতিতে সমার্থক। মমতাকে ছাড়া তৃণমূলের কোনো অস্তিত্ব থাকা সম্ভব— দেড় মাস আগেও কারও পক্ষে এমন কিছু ভাবা অসম্ভব ছিল। ১৯৯৮ সালে জাতীয় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন মমতা। সেই সময় মমতা অভিযোগ করতেন, কংগ্রেস হলো সিপিআইএম-এর ‘বি টিম’।
মমতা তৃণমূল প্রতিষ্ঠা করার পরে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলই হয়ে উঠল প্রধান বিরোধী দল। হতদরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা মমতা ছিলেন যুব কংগ্রেসের নেত্রী। ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট বামপন্থী নেতাকে পরাজিত করে গোটা দেশের নজরে আসেন তিনি। যুব কংগ্রেসের নেত্রী হিসেবে ‘একুশে জুলাই’ রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। বেশ কিছু কংগ্রেস কর্মীর মৃত্যু হয়। পশ্চিমবঙ্গের প্রদেশ কংগ্রেসের তৎকালীন প্রবীণ নেতাদের বিরুদ্ধে মমতার বিদ্রোহ দলের নিচুতলায় বিপুল সমর্থন পায়। সে সময় প্রদেশ কংগ্রেসের নেতৃত্বে একঝাঁক হেভিওয়েট নেতা— সোমেন মিত্র, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, প্রণব মুখোপাধ্যায়, বরকত গনিখান চৌধুরী। কিন্তু জনপ্রিয়তায় মমতা তাদের সবাইকে পেছনে ফেলে দেন। প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি পদ নিয়ে সোমেন মিত্রের সঙ্গে তার সংঘাত তীব্রতর হয়। তার কিছুদিন আগে কংগ্রেসের অন্তর্বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে নাটকীয়ভাবে মমতা আত্মহত্যার হুমকি দেন। যদিও কংগ্রেসের সর্বভারতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। বিশেষত, সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে মমতার হৃদ্যতা ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে মমতার দ্বন্দ্ব এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে বিচ্ছেদ ছাড়া কারও কাছেই আর কোনো রাস্তা ছিল না। অবশেষে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল তৈরি করলেন। দাবি করলেন, পশ্চিমবঙ্গে তারাই ‘আসল কংগ্রেস’। মজার বিষয় হলো, ২৮ বছর পর যারা মমতাকে বাদ দিয়ে তৃণমূলের নতুন কর্মসমিতি গঠন করলেন, তারাও নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলেই দাবি করছেন।
তিনি কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল তৈরি করলেন। দাবি করলেন, পশ্চিমবঙ্গে তারাই ‘আসল কংগ্রেস’। মজার বিষয় হলো, ২৮ বছর পর যারা মমতাকে বাদ দিয়ে তৃণমূলের নতুন কর্মসমিতি গঠন করলেন, তারাও নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলেই দাবি করছেন
তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর মমতা কখনো ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে জোট করেছেন, কখনো জোট করেছেন কংগ্রেসের সঙ্গে। সীমিত নির্বাচনী সাফল্য পেয়েছেন। পরিস্থিতির পরিবর্তন হয় ২০০৭ সাল থেকে। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হয়। সিপিআইএম ক্রমে জমি হারাতে শুরু করে। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিপুল শক্তি বৃদ্ধি হয় তৃণমূলের। তখন কংগ্রেসের সঙ্গে মমতার জোট, সঙ্গী বামপন্থী দল এসইউসি। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের ৩৪ বছরের বামপন্থী শাসনের অবসান হয়। মমতা মুখ্যমন্ত্রী হন। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে তিনি পরাজিত হলেন।
পরাজয়ের পরবর্তী সময়ে তৃণমূল কংগ্রেস যেভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে, সেটি ভারতীয় রাজনীতিতে নজিরবিহীন, অস্বাভাবিক। ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের পরাজয় গোটা দেশকে আলোড়িত করেছিল। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ইন্দিরা দুর্দান্ত কামব্যাক করেছিলেন। তামিলনাড়ুতে জয়ললিতা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। বিহারে লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল, উত্তরপ্রদেশে মুলায়ম সিং যাদব ও পরবর্তীকালে অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি, মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি বারবার নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে। দিল্লিতে আম আদমি পার্টি, পাঞ্জাবি আকালি দল হেরেছে। কর্ণাটকে বহুবার হেরেছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার দল জেডি(এস)। কোথাও দেখা যায়নি পরাজিত দলটি মাত্র মাসখানেকের মধ্যে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে বা দলের প্রধানকেই অপসারণ করা হচ্ছে।
তৃণমূল এখন কার্যত তিনটি টুকরো। একটি অংশ হলো পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় নির্বাচিত অধিকাংশ সদস্যের গোষ্ঠীটি, যারা নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছেন এবং মমতাকে বাদ দিয়ে জাতীয় কর্মসমিতি গঠন করে ফেলেছেন। এই অংশের নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, অরূপ রায়, সন্দীপন সাহা, অরূপ বিশ্বাস প্রমুখ। তৃণমূলের দলীয় তহবিলও এই অংশের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই ‘আসল তৃণমূল’ খাতায়-কলমে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার প্রধান বিরোধী দল।
দ্বিতীয় অংশটি সক্রিয় রয়েছে দিল্লিতে। পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা আসন ৪২টি। ২০২৪ সালে তৃণমূলের ২৯ জন জয়ী হয়েছিলেন। তাদের একজন মারা গিয়েছেন। বাকি ২৮ জনের মধ্যে ২০ জন মমতার হাত ছেড়ে ‘এনসিপিআই’ নামে একটি কাগুজে দলে যোগ দিয়েছেন। এই ২০ জন সাংসদ জানিয়েছেন, তারা লোকসভায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকেই সমর্থন করবেন। এই অংশের গুরুত্বপূর্ণ মুখ লোকসভায় দীর্ঘদিন তৃণমূলের দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, বহুদিনের সাংসদ কাকলী ঘোষদস্তিদার, শতাব্দী রায়, সায়নী ঘোষ প্রমুখ।
বলা বাহুল্য, কলকাতা ও দিল্লিতে সক্রিয় এ দুই গোষ্ঠীই সরাসরি বিজেপির মদদপুষ্ট। তৃতীয় অংশটি হলো বিধায়ক, সাংসদ এবং তৃণমূল নেতাদের একটি ছোট অংশ, যারা এখনো মমতার সঙ্গে রয়েছেন। যদিও প্রতিদিন এই অংশের শক্তি কমছে। কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম যেমন কিছুদিন আগেও মমতার সঙ্গে ছিলেন, এখন তিনি অন্য শিবিরে।
আপাতত প্রধান প্রশ্ন হলো, মমতা কি আদৌ রাজনৈতিকভাবে কামব্যাক করতে পারবেন? কাজটা শুধু কঠিন নয়, ভীষণ কঠিন। কারণ, যে মমতা ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত কংগ্রেসের ভেতরে লড়েছেন, যিনি ১৯৯৮ সালে তৃণমূল তৈরি করে ১৩ বছরের মধ্যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, সেই মমতা আর নেই। মমতাকে রাজ্যের বিরাট অংশের মানুষ ডাকতেন ‘দিদি’ বলে। ‘দিদি’র ডাকে ময়দান উপচে পড়ত মানুষের ভিড়ে। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে ‘দিদি’ মমতার রাজনৈতিক মৃত্যু ঘটল; উত্থান হলো ‘সিএম’ মমতার। ২০২১ থেকে তিনি পরিণত হলেন ‘আইপ্যাক’ নামক একটি বেসরকারি সংস্থার দ্বারা পরিচালিত মুখ্যমন্ত্রীতে। যে মমতা রাজ্যের প্রতিটি ব্লকের কর্মীদের নামে চিনতেন, সেই মমতা আর নেই। তৃণমূলের অন্দরেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবল উত্থান ঘটেছে। তৈরি হয়েছে ‘টিম অভিষেক’, যারা মমতার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কর্মীদের কোণঠাসা করেছে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর তৃণমূল ত্যাগের পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল অভিষেকের সঙ্গে বিরোধ। একই সঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চূড়ান্ত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়েছে তৃণমূল। দুর্নীতি ও অভিষেক— এ দুটি বিষয় হলো মমতার ‘আকিলিস হিল’।
রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমর্থন ছিল মমতার শক্তির জায়গা। অথচ মমতা শুরু করলেন মন্দিরের রাজনীতি। অযোধ্যার ধাঁচে দীঘায় বিরাট মন্দির তৈরি করলেন তিনি। নিউ টাউনে বিপুল অর্থ খরচ করে তৈরি করলেন দুর্গাঙ্গন। তার সঙ্গে রাজ্যের পূজা কমিটিগুলোকে অর্থ দেওয়া তো ছিলই। মমতার এই ‘নরম হিন্দুত্বে’র রাজনীতি সংখ্যালঘুদের হতাশ করেছে। রামনবমীতে বিজেপি নেতাদের মতোই তৃণমূলের নেতারাও অস্ত্র হাতে মিছিল করেছেন নিজেদের ‘ভালো হিন্দু’ প্রমাণের তাগিদে। ফলে ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমর্থন হারিয়েছেন মমতা।
এত কিছুর পরও যে কথা না বললেই নয়, সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল যে ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছে, সেটি মমতার জন্যই পেয়েছে। যারা এখন নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করছেন, তারা জিতেছেন মমতার ছবি পেছনে ছিল বলেই। কিন্তু সেটি কি তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের জন্য যথেষ্ট? সম্ভবত না। মমতার বয়সও হয়েছে। তিনি সত্তরোর্ধ্ব। ফলে রাজপথের রাজনীতিতেও তার পক্ষে আগের মতো ঝড় তোলা কঠিন।
১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূলের জন্মলগ্নে বিজেপির সমর্থন ছিল। বিজেপির স্ট্র্যাটেজি ছিল রাজ্যে রাজ্যে কংগ্রেস ভেঙে আঞ্চলিক দল তৈরি করা। তৃণমূলের প্রথম জোটসঙ্গীও বিজেপি। ২৮ বছর পরে সেই বিজেপির হাতেই মমতা পতন হলো। আশু প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাও চোখে পড়ছে না।
লেখক: ‘দি ইন্টারন্যাশনাল’ পত্রিকার এক্সিকিউটিভ এডিটর, কলাম লেখক





