প্রতিশ্রুতির অভাব নেই, অভাব...

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যেকোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার সাধারণত নানা প্রতিশ্রুতি ও আশার বাণীতে ভরপুর থাকে। বর্তমান সরকারি দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও বিনামূল্যে শিক্ষা, পরিবারভিত্তিক সহায়তা কার্ড, সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব (উচ্চকক্ষে ১০ শতাংশ), নারীবান্ধব পরিবহন ও সামাজিক সুরক্ষার মতো ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে মূল প্রশ্ন হলো— এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তব জীবনে কতটা কার্যকর হবে? বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের প্রধান সংকট শুধু প্রতিশ্রুতির অভাব নয়, বরং বাস্তবায়নের কাঠামোগত অভাব। নীতি, প্রকল্প ও বক্তৃতায় নারী থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ চলাচল এবং সামাজিক মর্যাদায় নারীর অবস্থান এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।
বিনামূল্যে শিক্ষা: ফি মওকুফই কি শেষ কথা?
মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার প্রতিশ্রুতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় মেয়েদের শিক্ষার পথে বাধা শুধু বেতন বা ভর্তি ফি নয়; বড় বাধা হলো দূরত্ব, নিরাপত্তাহীনতা, পারিবারিক অনুমতি, বাল্যবিয়ে এবং সামাজিক নজরদারি। একটি প্রান্তিক পরিবারের মেয়ের কলেজ যদি দূরবর্তী হয়, তবে শুধু ফি মওকুফ করলেই সে পড়তে যেতে পারবে না, যদি না নিরাপদ যানবাহন ও পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়। এ ছাড়া শিক্ষার মান ও কর্মমুখী যোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। মানহীন শিক্ষা শুধু সনদ বিতরণে পরিণত হবে। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য শিক্ষা এমন হতে হবে, যা তাকে অধিকার-সচেতন ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলে।
সংসদে ১০ শতাংশ নারী আসন: ক্ষমতা নাকি প্রতীকী উপস্থিতি?
সংসদের উচ্চকক্ষে ১০ শতাংশ নারী রাখার প্রস্তাবটি ইতিবাচক মনে হলেও, এটি প্রকৃত ক্ষমতার বণ্টন নাকি শুধুই প্রতীকী উপস্থিতি, তা ভাবার বিষয়। প্রতিনিধিত্ব তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রণয়নে প্রভাব ফেলার ক্ষমতা পায়। যদি পুরুষ-প্রধান দলীয় কাঠামোই ঠিক করে দেয় কোন নারী মনোনীত হবেন, তবে সেই প্রতিনিধিত্ব স্বাধীন হতে পারে না। দল-অনুমোদিত সাজানো দৃশ্যমানতা দিয়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো বদলায় না। সংখ্যার পাশাপাশি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং দলীয় কাঠামোর ভেতরে নারীর প্রকৃত দরকষাকষির ক্ষমতা থাকা আবশ্যক।
পরিবারের নারী সদস্যের নামে কার্ড দেওয়া একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু টাকা কার নামে আসছে আর কে ব্যবহার করছে, এর মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে
পরিবারভিত্তিক সহায়তা কার্ড: নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
পরিবারের নারী সদস্যের নামে কার্ড দেওয়া একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু টাকা কার নামে আসছে আর কে ব্যবহার করছে, এর মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। বহু পরিবারে নারী ব্যাংক হিসাবের নামধারী মালিক হলেও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেন পুরুষ সদস্য। মানসিক চাপ বা পারিবারিক কর্তৃত্ব খাটিয়ে সেই টাকা পুরুষরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিলে কাগজে নারী ক্ষমতায়িত হলেও বাস্তবে নিয়ন্ত্রিতই থেকে যান। তাই নগদ সহায়তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সচেতনতা, গোপন অভিযোগের ব্যবস্থা এবং ঘরের ভেতরের অর্থনৈতিক নির্যাতন চিহ্নিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
নারীবান্ধব পরিবহন: আলাদা বাস বনাম নিরাপদ জনপরিসর
নারীদের জন্য আলাদা বাসের ব্যবস্থা সাময়িক স্বস্তি দিলেও এটি সমস্যার কাঠামোগত সমাধান নয়। এতে মূল গণপরিবহন ব্যবস্থার দায়মুক্তি তৈরি হয় এবং বার্তা যায় যে, সাধারণ পরিবহন শুধু পুরুষদের। বাংলাদেশের গণপরিবহন সংকট নারী, শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধীসহ সবার। তাই পুরো ব্যবস্থাটিকে নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে। আলাদা কামরায় বন্দি না করে সাধারণ জনপরিসরেই নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত, কারণ নারী একজন পূর্ণ নাগরিক, কোনো ব্যতিক্রমী যাত্রী নন।
ভাতা ও সামাজিক সুরক্ষা: পরনির্ভরশীলতা এড়ানোর উপায়
দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ভাতা প্রয়োজন। তবে ক্ষমতায়ন শুধু ভাতানির্ভর হলে দীর্ঘমেয়াদে পরনির্ভরশীলতা বাড়ে। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য দরকার দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, শিশুযত্ন কেন্দ্র, নারীবান্ধব ঋণ ও বাজার সংযোগ। নারীকে শুধু সহায়তা গ্রহণকারী বা ভাতাভোগী হিসেবে না দেখে, অর্থনৈতিক শক্তি ও উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বাস্তবায়নের পাঁচ দফা শর্ত
এই প্রতিশ্রুতিগুলো স্লোগান হিসেবে না রেখে বাস্তবায়নযোগ্য করতে হলে পাঁচটি পদক্ষেপ জরুরি—
১. স্পষ্ট বাজেট বরাদ্দ: কোন স্তরে, কতজন নারীর জন্য, কোন মন্ত্রণালয় থেকে কত বরাদ্দ— তা সুনির্দিষ্ট করা।
২. আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়: শিক্ষা, পরিবহন, স্থানীয় সরকার, শ্রম ও মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কাজের সমন্বয় করা।
৩. তৃণমূল পর্যায় শক্তিশালীকরণ: ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষিত কর্মী এবং নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৪. সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন: পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের ইতিবাচক রূপান্তর।
৫. স্বাধীন নজরদারি: নারী সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও গবেষকদের সরকারি কাজের মূল্যায়নে যুক্ত করা।
উপসংহার
নির্বাচনী ইশতেহার আমাদের আশা দেখায়। কিন্তু নারীর বাস্তব মুক্তি ও ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব হবে, যখন রাষ্ট্র নারীকে শুধু ‘সহায়তার বস্তু’ হিসেবে না দেখে পূর্ণ নাগরিক, প্রধান সিদ্ধান্তগ্রহণকারী এবং দেশের মূল অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেবে।
লেখক: ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশন্স স্ট্র্যাটিজিস্ট




